আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া আইনজ্ঞ ও বিচারক নাভানেথাম ‘নাভি’ পিলাই। ৮৫ বছর বয়সী এই বিচারক জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েও আলোচনায় আসেন তিনি। ওই কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত দেয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। কমিটি জানায়, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য পিলাইকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা এ স্বীকৃতির অন্যতম ভিত্তি। আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার গুরুত্বও তুলে ধরেছে এ পুরস্কার।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিলাইয়ের কাজকে বিশ্বজুড়ে আরও শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করেছে নোবেল কমিটি। কমিটির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাঁর পুরস্কার একটি বার্তা।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া পিলাই বেড়ে উঠেছেন বর্ণবাদী বৈষম্যের পরিবেশে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনামলে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। কারাবন্দি নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যান্য বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েও ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৬৭ সালে আইন পেশা শুরু করার পর পিলাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশে কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে নিজস্ব আইনচর্চা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ণবাদী শাসনামলে রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে পরিচিত করে তোলে। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। দেশটির হাইকোর্টে বিচারক হওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী ছিলেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন পিলাই। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেখানে গণহত্যা ও যৌন সহিংসতাসংক্রান্ত অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন। রুয়ান্ডার গণহত্যার মামলায় যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে ওই ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায় আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে আছে।
২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্ট বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে থাকাকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংঘাত ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার বিষয় নিয়ে কাজ করেন। এ সময় ইসরায়েলের নীতি ও ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বক্তব্যও আলোচনায় আসে।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের শতাধিক সদস্য তাঁর কাছে চিঠি পাঠিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে পিলাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল্যায়নে নোবেল কমিটি আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর সামগ্রিক অবদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
গাজা নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত
পিলাইয়ের সাম্প্রতিক আলোচিত ভূমিকা ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ড ও ইসরায়েলবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনকে ঘিরে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধীনে গঠিত এই কমিশন ২০২১ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি তদন্ত করে আসছে। পিলাই কমিশনটির নেতৃত্ব দেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় কমিশনের তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, গাজায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী গণহত্যা কনভেনশনে সংজ্ঞায়িত পাঁচটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে চারটি সংঘটিত করেছে বলে তাদের তদন্তে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে এমন জীবনযাপনের পরিস্থিতি তৈরি এবং জন্ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সামরিক কর্মকাণ্ডের ধরন বিশ্লেষণ করে গাজার ফিলিস্তিনিদের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কমিশন আরও জানায়, গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর জন্য দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করেনি।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কমিশনের প্রধান হিসেবে পিলাই বলেন, গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ড গণহত্যা কনভেনশনে নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কমিশন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের কিছু বক্তব্যকে গণহত্যায় উসকানির অভিযোগের সঙ্গেও যুক্ত করে।
তবে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। পিলাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিশন জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থা; এটি কোনো ফৌজদারি আদালত নয়। ফলে কমিশনের প্রতিবেদনে ইসরায়েলকে গণহত্যার জন্য দায়ী বলার অর্থ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে দেশটিকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। ইসরায়েল কমিশনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এর অনুসন্ধানের বিরোধিতা করেছে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় পিলাইয়ের ভূমিকা এখানেই শেষ নয়। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় গাম্বিয়ার মনোনীত অস্থায়ী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অভিযোগ দায়ের করে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত অপরাধের বিচার ও দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তাঁর এই দায়িত্ব আন্তর্জাতিক আইন অঙ্গনে তাঁর অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।
পিলাইয়ের নোবেলপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে। এ বছরের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। আগামী ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মাননা দেওয়া হবে।
সূত্র: নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও জাতিসংঘ।