আইনি জটিলতায় কিশোর গ্যাং, বাড়ছে অপরাধ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হলেও থামছে না কিশোর অপরাধ। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, মারামারি, অস্ত্র বহন, হামলা ও হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে বিপুলসংখ্যক কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণকে আটক করা হলেও তাদের একটি অংশকে বয়স ও আইনি বিধানের কারণে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এতে অপরাধে জড়িতদের একটি অংশ পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় একযোগে চলছে। কুমিল্লায় গত ২০ সেপ্টেম্বর ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর নতুন করে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান শুরু হয়। ৩ অক্টোবর পর্যন্ত কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী বখাটেদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে মোট ১ হাজার ৬৭২ জনকে আটক বা গ্রেপ্তারের তথ্য এসেছে।

এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের আট উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩৭০ জনকে আটক করে পুলিশ। একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় এক অভিযানে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকসহ বিভিন্ন মামলার ৫২ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য জানায় পুলিশ।

২ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরে আবারও কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। পাঁচ ঘণ্টার অভিযানে ৯৯ জনকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তিন দিনের অভিযানে জেলায় মোট ৫৪৭ জনকে আটক করার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজধানীতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে পল্লবীর একটি কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিকের বাসায় গুলি চালানোর ঘটনায় ওই গ্যাংয়ের এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তি ‘ভইরা-দে’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি ও মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়মিতই সামনে আসছে। মোহাম্মদপুরে স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের মতবিনিময় সভাতেও কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি কাঠামো ও বাস্তব প্রয়োগের সমন্বয়। বাংলাদেশে ১৮ বছর বা তার কম বয়সী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর জন্য আলাদা বিচারিক ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা সদরে শিশু আদালত থাকার বিধানও আইনে রয়েছে।

আইনে শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশু আদালতে কোনো শিশুর মামলা বিকল্প পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি না হলে, অপরাধটি জামিনযোগ্য বা অজামিনযোগ্য দুই ক্ষেত্রেই আদালত নির্দিষ্ট শর্তে তাকে জামিন দিতে পারে। নিজের মুচলেকা কিংবা বাবা-মা, অভিভাবক, প্রবেশন কর্মকর্তা বা উপযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানেও জামিন দেওয়ার বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ও আটকের ওপরও বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। ৯ বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো অবস্থাতেই গ্রেপ্তার বা আটক করা যায় না। আইনে শিশুর বয়স, পরিপক্বতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ফলে কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলেই প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর মতো ব্যবস্থা নিতে পারে না। বয়স যাচাই, অভিভাবকের জিম্মা, শিশু আদালত, প্রবেশন ও পুনর্বাসনের মতো বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করছে।

তবে শিশুদের জন্য আইনে যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেটিকে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সমস্যা হচ্ছে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন, নজরদারি ও অপরাধের মূল হোতাদের শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, সেটি নিয়ে। কোনো কিশোরকে আটক করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পর তার আচরণ পরিবর্তনে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি না থাকলে সে আবারও অপরাধী চক্রে ফিরে যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। কিশোরদের সামনে রেখে চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন, ছিনতাই কিংবা আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধ পরিচালিত হলে শুধু কিশোরদের আটক করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এসব চক্রের অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অস্ত্র সরবরাহকারী ও মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সম্প্রতি এ নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২ অক্টোবর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আগামী তিন মাসের মধ্যে কিশোর গ্যাং উৎখাতের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে কিশোরদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু ধরপাকড় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া যাবে না। পরিবারের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি ও আচরণ পর্যবেক্ষণ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, মাদক থেকে দূরে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধী চক্রের প্রভাব ও কিশোরদের অনলাইনভিত্তিক সংঘবদ্ধতার বিষয়টিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশু আইনের সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে শুধু শাস্তি দেওয়ার বদলে তাকে অপরাধের পরিবেশ থেকে বের করে আনা যেমন জরুরি, তেমনি কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধ পরিচালনা করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন। তা না হলে একদিকে বিপুলসংখ্যক কিশোর আটক হবে, অন্যদিকে অপরাধের মূল কাঠামো অক্ষত থেকে যাবে। আর সেই সুযোগেই নতুন নতুন কিশোর গ্যাং তৈরি হয়ে অপরাধের বিস্তার ঘটাতে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ