* বরেন্দ্রে বিএমডিএর নতুন সেচ নীতিমালা নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ
* এক মৌসুম পরপর চাষের সুযোগ, রাজশাহী-নওগাঁ-চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিপাকে কৃষক
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিনির্ভর জনপদে বোরো আবাদ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নতুন সেচ নীতিমালার কারণে এবার বিপুল পরিমাণ আবাদযোগ্য জমি চাষের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের যেসব এলাকায় কৃষকেরা বিএমডিএর গভীর নলকূপের সেচের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এক মৌসুমে জমির একটি অংশে আবাদ এবং পরের মৌসুমে অন্য অংশে আবাদ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, জমি আছে, বীজ আছে, সার আছে কিন্তু সেচের নিশ্চয়তা না থাকায় জমিতে ধান ফলানোর সুযোগ থাকছে না। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদন কমবে, অন্যদিকে দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদনও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, নতুন সেচ নীতিমালার কারণে হাজার হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে রাজশাহীতে ৭০ হাজার ২৬৫ হেক্টর, নওগাঁয় ১ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তিন জেলায় মোট লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার হেক্টর। কিন্তু সেচের সীমাবদ্ধতার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে বোরো ধানের জন্য সেচ অপরিহার্য। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস সীমিত হওয়ায় কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করে আসছেন। বিএমডিএর সেচব্যবস্থার আওতাধীন জমিতে এবার সেচের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়ার ফলে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি গভীর নলকূপ বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৬০ ঘণ্টা চলবে। বোরো মৌসুমে এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৯৮০ ঘণ্টার বেশি নলকূপ চালানোর সুযোগ থাকবে না। ফলে একটি সেচ স্কিমের আওতাধীন জমিকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করে এক ভাগে এক মৌসুমে এবং অন্য ভাগে পরবর্তী মৌসুমে বোরো চাষের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর। কারণ বোরো ধান এমন একটি ফসল, যার পুরো উৎপাদনকালজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন সেচ প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে পানি না পৌঁছালে ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে শিষ বের হওয়া ও দানা বাঁধার সময় পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার শীতলডাঙ্গা গ্রামের কৃষকেরা জানিয়েছেন, নতুন নিয়মের কারণে তাঁদের সেচ স্কিমের জমি দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। এক ভাগে এবার বোরো হবে, অন্য ভাগে পরেরবার। এতে বিপুল পরিমাণ জমি এক মৌসুমে পতিত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর তানোরের কৃষকদেরও একই ধরনের উদ্বেগ। তাঁদের আশঙ্কা, সেচের সময় কমে গেলে যাঁদের জমি কম এবং যাঁরা প্রভাবশালী নন, তাঁরা প্রয়োজনীয় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ফলে জমি থাকা সত্ত্বেও চাষ করা সম্ভব হবে না।
কৃষকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যে জমিতে প্রতি বছর ধান উৎপাদন হয়, সেই জমি কেন এক বছর পরপর চাষ করতে হবে?
কৃষি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং পানি ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে সেচ ব্যবস্থাপনার এমন পদ্ধতি দরকার, যাতে পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ে এবং কৃষকের আবাদও বজায় থাকে। শুধু সেচ কমিয়ে দিলে কৃষকের আবাদ কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক উম্মে ছালমা বলেছেন, নতুন সেচ নীতিমালার কারণে হাজার হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য বিএমডিএকে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ কৃষি বিভাগ নিজেও বিষয়টির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে অবগত। এখন প্রশ্ন হলো পানি ব্যবস্থাপনার সংকট সমাধানের দায়িত্ব কি কেবল কৃষকের জমি কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পূরণ করা হবে, নাকি বিকল্প সেচব্যবস্থাও তৈরি করা হবে?
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি অনেকাংশেই বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এসব জেলার বিস্তীর্ণ বরেন্দ্রভূমিতে বোরো শুধু একটি ফসল নয়; কৃষকের সারা বছরের আয়, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় বাজারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত।
একটি জমি এক মৌসুমে অনাবাদি থাকলে ক্ষতি শুধু ওই জমির ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জমির মালিকের আয় কমে, কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার কমে এবং স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহও কমে যায়। ধান উৎপাদন কমে গেলে পরবর্তী সময়ে বাজারে সরবরাহের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচসংকট নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও রাজশাহীতে ডিজেল সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে হাজার হাজার সেচ পাম্প বন্ধ থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তখন কৃষি-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ৪ হাজার ২০০টির বেশি সেচ পাম্প বন্ধ থাকায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হয়। ফলে এবার নীতিগতভাবে সেচের সময় কমানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আগের সমস্যাগুলো যুক্ত হলে কৃষকের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
অবশ্য বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বোরো চাষ, আমবাগান ও অন্যান্য ফসলের সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিএমডিএর অধিভুক্ত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় বিএমডিএর গভীর নলকূপ রয়েছে ১৫ হাজার ৯৬৫টি। এর পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রায় ৫৬ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপও পানি উত্তোলন করছে।
অর্থাৎ পানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ধরে রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল পুনঃখনন এবং সেচব্যবস্থায় পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ চাপ কমানো সম্ভব।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষিতে পদ্মার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে রাজশাহী অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ ব্যাহত হয় এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনাকে এ অঞ্চলের কৃষিতে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে। তার আগ পর্যন্ত চলতি মৌসুমের কৃষক কী করবেন সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কৃষকের কাছে জমি অনাবাদি থাকা মানে সরাসরি আয় হারানো। একটি মৌসুমের চাষ বন্ধ হয়ে গেলে তাঁকে শুধু ফসলের সম্ভাব্য লাভই হারাতে হয় না; জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, শ্রম ও অন্যান্য কৃষি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত পুরো অর্থনৈতিক চক্রটিও সংকুচিত হয়।
তাই ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা যেমন আছে, তেমনি কৃষকের আবাদ নিশ্চিত করার দায়িত্বও রয়েছে। সেচ নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে কোন এলাকায় কত পানি আছে, কত জমিতে কী পরিমাণ সেচ প্রয়োজন, বিকল্প পানির উৎস কতটা কার্যকর এবং কৃষকের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা এখন এমন একটি সমাধান চান, যেখানে পানির অপচয়ও বন্ধ হবে, আবার জমিও পতিত থাকবে না। কারণ আবাদযোগ্য জমি থাকা সত্ত্বেও শুধু সেচের অভাবে যদি হাজার হাজার হেক্টর জমি পড়ে থাকে, তাহলে সেটি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এর প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও দেশের খাদ্য উৎপাদনেও।
এ অবস্থায় নতুন সেচ নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা পুনর্মূল্যায়ন, কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিকল্প সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নদী-খাল ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
নইলে পানি বাঁচাতে গিয়ে যদি জমি বাঁচানো না যায়, তাহলে একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা পেলেও অন্যদিকে কৃষকের আবাদ, আয় ও খাদ্য উৎপাদন তিনটিই নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে।