আজ ২৪ সেপ্টেম্বর। উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বেদনার, একই সঙ্গে গৌরবের দিন। আজ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতি দিবস। ১৯৩২ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনার পর ব্রিটিশ পুলিশের হাতে বন্দি হওয়ার আশঙ্কায় মাত্র ২১ বছর বয়সে নিজের জীবন বিসর্জন দেন তিনি। তাঁর সেই আত্মত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক তরুণীর আপসহীন প্রতিবাদের প্রতীক।
চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাটের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রীতিলতা ছিলেন সাধারণ পরিবারের অসাধারণ এক সন্তান। সময়টা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের। রাজনৈতিক অধিকার সীমিত, অর্থনৈতিক শোষণ তীব্র, আর বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিনিয়ত পদদলিত। এমন এক বাস্তবতায় একজন নারী হিসেবে প্রীতিলতার বিপ্লবী আন্দোলনে যুক্ত হওয়া ছিল এক সাহসী সিদ্ধান্ত।
প্রীতিলতার জীবনকে শুধু একটি বিপ্লবী অভিযানের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন শিক্ষিত, মেধাবী ও সমাজসচেতন এক তরুণী। শিক্ষাজীবনে তাঁর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতাও করেছেন। কিন্তু চারপাশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ বা নিরাপদ জীবনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁর জীবনকে নতুন পথে নিয়ে যায়। সূর্য সেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিপ্লবী সংগঠনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সেই সংগ্রামে নারী-পুরুষের প্রচলিত বিভাজনকে অতিক্রম করে প্রীতিলতা নিজেকে যুক্ত করেন।
প্রীতিলতার বিপ্লবী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধলঘাটের সংঘর্ষ। বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর সংঘর্ষের মধ্যে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন। পরবর্তী সময়ে সূর্য সেনের নির্দেশে তিনি পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পান।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি তখন ঔপনিবেশিক বৈষম্যের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই সময়ের বর্ণবাদী ঔদ্ধত্যের চিহ্ন কথাটি ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। এই ধরনের বৈষম্যমূলক মানসিকতা শুধু একটি ক্লাবের দরজায় লেখা কয়েকটি শব্দ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্নিহিত জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছিল।
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে বিপ্লবীরা পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ চালান। অভিযানে বিপ্লবীরা সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হন। অভিযান শেষে ফিরে আসার সময় প্রীতিলতা গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তিনি বুঝতে পারেন, ব্রিটিশ পুলিশের হাতে জীবিত ধরা পড়লে তাঁকে নির্মম নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে।
তাঁর সঙ্গে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড তিনি গ্রহণ করেন। মাত্র ২১ বছরের একটি জীবন সেদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় এক অমর কিংবদন্তি। প্রীতিলতার আত্মাহুতি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্নও রেখে যায় একটি স্বাধীন দেশের জন্য একজন তরুণীকে কেন নিজের জীবন দিতে হয়েছিল?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাসে। ব্রিটিশ শাসন শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ। সেই বাস্তবতায় স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রামও।
প্রীতিলতার সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এখানেই তিনি ভয়কে অতিক্রম করেছিলেন।
একজন তরুণী, যাঁর সামনে ছিল দীর্ঘ জীবন, ব্যক্তিগত স্বপ্ন, পরিবার, পেশা ও ভবিষ্যৎ। কিন্তু তিনি এমন এক সময়ের সন্তান ছিলেন, যখন ব্যক্তিগত স্বপ্নের সঙ্গে জাতীয় মুক্তির স্বপ্ন একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, পরাধীনতার মধ্যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কোনো পূর্ণতা নেই।
তবে ইতিহাসকে শুধু রোমান্টিক আবেগ দিয়ে দেখলে চলবে না। বিপ্লবীদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি, রাজনৈতিক কৌশল এবং তার পরিণতি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে সন্দেহ নেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে প্রীতিলতার আত্মত্যাগ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রীতিলতা ছিলেন নারী। সে সময় সমাজে নারীর চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মজীবন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নানা সামাজিক বিধিনিষেধে আবদ্ধ ছিল। সেই বাস্তবতায় একজন তরুণীর হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া এবং বিপ্লবী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ছিল প্রচলিত সামাজিক ধারণারও বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ।
তাই প্রীতিলতার ইতিহাস কেবল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস নয়; এটি বাঙালি নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসেরও অংশ।
আজ যখন তাঁর আবক্ষমূর্তিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হবে, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে, তখন শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কেন প্রীতিলতা জীবন দিয়েছিলেন? কোন সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন? স্বাধীনতার মূল্য কতটা গভীর ছিল?
স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেবল জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা বা কয়েকটি মুখস্থ করা নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রীতিলতার আত্মত্যাগের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস বয়সের ওপর নির্ভর করে না।
মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যার প্রতিধ্বনি প্রায় এক শতাব্দী পরও শোনা যায়।
আজকের প্রজন্মের কাছে প্রীতিলতার শিক্ষা কী?
সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো স্বাধীনতা কখনো বিনামূল্যে আসে না। একটি জাতির স্বাধীনতার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মনিবেদন। তাঁদের কেউ ইতিহাসের পাতায় বড় করে লেখা হয়েছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। কিন্তু প্রত্যেকের অবদান মিলেই স্বাধীনতার ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
প্রীতিলতা সেই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নাম।
তাঁর হাতে ছিল অস্ত্র, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংকল্প। তাঁর বয়স ছিল অল্প, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশাল। তাঁর জীবন ছিল ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ দীর্ঘস্থায়ী।
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর, তাঁর আত্মাহুতির দিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায়। চট্টগ্রামের ধলঘাটের সেই মাটি, পাহাড়তলীর সেই ইতিহাস এবং সূর্য সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লবী সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো কেবল রাজনৈতিক স্লোগান থাকে না; কখনো তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকারে পরিণত হয়।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সেই অঙ্গীকারের নাম। তিনি চলে গেছেন ৯৪ বছর আগে। কিন্তু ইতিহাসে কিছু মৃত্যু আসলে মৃত্যু নয়। কিছু মৃত্যু একটি প্রজন্মকে জাগিয়ে দেয়, পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের মানুষের কাছে দায়িত্বের কথা বলে যায়।
প্রীতিলতার আত্মাহুতি তেমনই এক মৃত্যু যে মৃত্যু পরাজয়ের নয়, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকা এক প্রতীক।
বীরকন্যা প্রীতিলতা, আপনার প্রতি শ্রদ্ধা। আপনার আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম জানুক, বুঝুক এবং ইতিহাসকে আবেগের পাশাপাশি সত্য ও দায়িত্বের সঙ্গে ধারণ করুক এই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।