২০ আগষ্ট বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস : পরিচ্ছন্নতার সংকট, বদলাতে হবে অভ্যাস

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আমাদের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। বিশেষ কোনো দিবস এলেই পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়, হাতে ঝাড়ু নিয়ে মানুষ রাস্তায় নামেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে পরিচ্ছন্নতার নানা বার্তা। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় এক দিনের কর্মসূচির বাইরে আমাদের প্রতিদিনের জীবন কতটা পরিচ্ছন্ন?

বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

পরিচ্ছন্নতা শুধু রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার বিষয় নয়। এটি মানুষের অভ্যাস, নাগরিক দায়িত্ববোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি সামগ্রিক বিষয়। একটি দেশ কতটা পরিচ্ছন্ন, তা শুধু তার প্রধান সড়ক বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দেখে বোঝা যায় না। বরং বোঝা যায় মানুষ কীভাবে বর্জ্য ফেলে, সেই বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়, কোথায় নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তা ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে এসব বিষয় থেকে।

আমাদের শহর, নগর ও গ্রামাঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোথাও রাস্তার পাশে বর্জ্য জমে থাকে, কোথাও খাল বা নালায় বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা দেখা যায়, আবার কোথাও বাজার ও জনবহুল এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। এগুলো কোনো একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং পুরো সমাজের জন্য একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ।

পরিচ্ছন্নতার আলোচনা উঠলেই আমরা সাধারণত নাগরিক সচেতনতার কথা বলি। অবশ্যই নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য রাখা এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেকের দায়িত্ব। কিন্তু শুধু নাগরিককে সচেতন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

একজন মানুষ যদি নিজের বাসার বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে চান, তাহলে সেই বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহ না হলে কিংবা বর্জ্য রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতার জন্য নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা। একটি শহরের প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃচক্রায়নের সুযোগ বাড়ানোও প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্নতার পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ প্লাস্টিক বর্জ্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার ব্যাপক। বাজারের ব্যাগ থেকে শুরু করে খাবারের প্যাকেট, পানীয়র বোতল, বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক—অসংখ্য প্লাস্টিকজাত সামগ্রী প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমস্যা তৈরি হয় ব্যবহারের পর এসব সামগ্রীর সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে।

একটি প্লাস্টিকের প্যাকেট হয়তো একজন মানুষের কাছে খুব সামান্য বিষয়। কিন্তু একই ধরনের হাজার হাজার প্যাকেট যখন প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় জমতে থাকে, তখন তা বড় বর্জ্য সমস্যায় পরিণত হয়। পলিথিন বা প্লাস্টিক নালা-নর্দমায় জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। জলাশয়ে গেলে পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

তাই শুধু প্লাস্টিক উৎপাদন বা ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না। ব্যবহারের পর প্লাস্টিক কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে সংগ্রহ হচ্ছে এবং পুনঃব্যবহার বা পুনঃচক্রায়নের সুযোগ কতটা তৈরি হচ্ছে—সেদিকেও নজর দিতে হবে।

পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানুষের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্জ্য দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও কীটপতঙ্গের বিস্তারের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা হলে পানি ও মাটির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে শুধু সৌন্দর্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একটি রাস্তা পরিষ্কার থাকলে শহর সুন্দর দেখায় এটি সত্য। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হলে মানুষের বসবাসের পরিবেশও উন্নত হয়।

একইভাবে একটি খাল বা জলাশয় শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়; এটি নগরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে বর্জ্য জমতে থাকলে তার প্রভাব নানা দিক দিয়ে পড়তে পারে।

পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শেখানোর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করার। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখার। নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলার।

অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা এমন একটি বিষয়, যেখানে একজনের দায়িত্ব অন্যজনের দায়িত্বকে বাদ দেয় না।

আমরা যদি বলি, ‘শহর পরিষ্কার রাখা শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ’, তাহলে নাগরিকের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া হয়। আবার শুধু নাগরিককে দায়ী করলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত হয়।

বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবসে বড় আয়োজন করা যেতে পারে। শত শত মানুষ একসঙ্গে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে পারেন। একটি নির্দিষ্ট এলাকার বর্জ্য পরিষ্কার করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক।

কিন্তু পরদিন যদি আবার সেই জায়গায় বর্জ্য জমতে শুরু করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে আমরা আসলে কী পরিবর্তন করলাম? তাই পরিচ্ছন্নতা দিবসের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন একটি দিনের কর্মসূচি মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাস পরিবর্তনের কারণ হবে।

একজন মানুষ যদি প্রতিদিন একটি প্লাস্টিকের বোতল রাস্তায় না ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখেন, সেটিও পরিচ্ছন্নতার আন্দোলন। একজন দোকানি যদি দোকানের সামনে বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে রাখেন, সেটিও পরিচ্ছন্নতার অংশ। একটি পরিবার যদি বর্জ্য আলাদা করে রাখার অভ্যাস তৈরি করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

পরিচ্ছন্নতার আলোচনা অনেক সময় শুধু রাজধানী বা বড় শহরকে কেন্দ্র করে হয়। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন সর্বত্র। গ্রামের হাট-বাজার, ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজার, উপজেলা শহর, পর্যটন এলাকা, নদীর তীর সব জায়গাতেই সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। কোনো একটি জায়গাকে পরিচ্ছন্ন রাখলেই পুরো দেশ পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে না।

পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি তৈরি করতে হলে এটি শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমরা অনেক বিষয়ে আইন ও নিয়মের কথা বলি। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান শুধু আইন দিয়ে সম্ভব নয়। মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনও জরুরি। ছোটবেলায় একজন শিশুকে যদি শেখানো হয়—ময়লা মাটিতে ফেলা যাবে না, খাবারের প্যাকেট নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে, পানি ও পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না—তাহলে সেই শিক্ষা বড় হয়ে তার আচরণে প্রতিফলিত হতে পারে।

তাই পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা শুধু একটি দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন চর্চার অংশ করা দরকার।

একটি পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ে তোলা অসম্ভব কোনো কাজ নয়। তবে এটি এক দিনে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার ধারাবাহিক উদ্যোগ।

বর্জ্য কমাতে হবে। যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। খাল, নদী ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস তাই শুধু ঝাড়ু হাতে ছবি তোলার দিন নয়। এটি নিজের অভ্যাসের দিকে তাকানোর দিন। আমরা কতটা ময়লা তৈরি করছি? সেই ময়লা কোথায় ফেলছি? আমাদের ফেলে দেওয়া একটি প্যাকেট বা বোতল কোথায় গিয়ে জমছে? আমাদের একটি ছোট অসচেতনতার প্রভাব কি অন্য কারও জীবনে পড়ছে?

কারণ পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের নয়। এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়তো একটি রাস্তা পরিষ্কার করতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের সচেতনতা একটি সমাজের অভ্যাস বদলাতে পারে।

বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবসে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক নিজে ময়লা ফেলব না, অন্যকে ময়লা ফেলতে নিরুৎসাহিত করব, বর্জ্য যথাস্থানে রাখব এবং পরিচ্ছন্নতাকে কোনো একটি দিবসের কর্মসূচি নয়, প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তুলব।

তবেই পরিচ্ছন্নতার জন্য আমাদের হাতে শুধু এক দিনের ঝাড়ু থাকবে না; থাকবে একটি স্থায়ী অভ্যাস।

আর সেই অভ্যাসই একদিন গড়ে তুলতে পারে পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ