কিছু মৃত্যু শুধু একজন মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয় না একটি পরিবারকে জীবন্ত অবস্থায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কিছু হত্যাকাণ্ডের পর শোকের যে শুরু, তার কোনো শেষ নেই। কবরের মাটি শুকিয়ে যায়, ফুল শুকিয়ে যায়, মানুষের ভিড় কমে যায়, সংবাদপত্রের পাতায় খবরটি পুরোনো হয়ে যায় কিন্তু একজন বাব-মায়ের বুকের ভেতরের কান্না কখনো পুরোনো হয় না।
অপ্রতিমের মৃত্যুও তেমনই একটি কান্নার শুরু?
১৩ বছরের একটি শিশু। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। কুমিল্লার বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলে পড়ত। শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। সঙ্গে ছিল মায়ের আইফোন। স্বাভাবিক একটি বিকেল। একটি শিশুর কাছে যার অর্থ ছিল বন্ধু, ছবি, আনন্দ, বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে গল্প।
কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।
পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই–সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। সংবাদটি ছড়িয়ে পড়তেই একটি পরিবারের পৃথিবী যেন মুহূর্তে থমকে গেল।
মায়ের মুখের সেই প্রশ্ন ‘আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল?’ এই প্রশ্নের সামনে একটি সমাজের সমস্ত শব্দ যেন থেমে যায়।
একজন মা সন্তানকে জন্ম দেন শুধু তাকে হারানোর জন্য নয়। তিনি তার শিশুর প্রথম হাঁটা দেখেন, প্রথম কথা শোনেন, স্কুলের পোশাক গুছিয়ে দেন, পরীক্ষার ফল নিয়ে চিন্তা করেন, অসুস্থ হলে রাত জেগে থাকেন। সেই মা যখন একদিন সন্তানের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন—‘আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’ তখন সেটি কেবল একজন মায়ের ব্যক্তিগত আহাজারি থাকে না; সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের কাছেও এক গভীর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমের এমন আকুতি সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তাঁর প্রশ্ন ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো, সে কী অপরাধ করেছিলো, একজন শোকাহত মায়ের হৃদয়ভাঙা আর্তনাদ।
আমরা হয়তো বলব, তদন্ত হবে। আসামি ধরা পড়বে। আদালত বসবে। বিচার হবে। শাস্তি হবে।
কিন্তু একজন মায়ের কাছে বিচার কি শুধু আদালতের রায়ে শেষ হয়?
যে সকালে অপ্রতিম স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, সে সকালে তার মা হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবেন। কোনো কিশোরকে সাইকেলে যেতে দেখলে হয়তো মনে হবে এই বুঝি অপ্রতিম! কোনো ফোন বেজে উঠলে বুক কেঁপে উঠবে। কোনো পরিচিত কণ্ঠ শুনলে মনে হবে ছেলেটা কি ফিরে এলো?
তারপর বাস্তবতা আবার তাকে ভেঙে দেবে।
এভাবেই একটি হত্যাকাণ্ড আদালতের কাগজে একটি মামলা হলেও একটি পরিবারের জীবনে তা হয়ে যায় আজীবনের সাজা।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে পুলিশ নিজেই বলেছে, তদন্ত এখনো চলছে এবং হেফাজতে থাকা ব্যক্তি নির্দোষও হতে পারেন, আবার জড়িতও হতে পারেন। অর্থাৎ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী বলা যাবে না।
এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা বিচার চাইব কিন্তু বিচার যেন আবেগের বশে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে হয়। কারণ প্রকৃত বিচার মানে শুধু কাউকে গ্রেপ্তার করা নয়; প্রকৃত বিচার মানে সত্য উদঘাটন করা। কে অপ্রতিমকে শেষবার কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, কী ঘটেছিল, কীভাবে তার মৃত্যু হলো, মোবাইল ফোনের ভূমিকা কী ছিল, হত্যার পেছনে আর কোনো কারণ ছিল কি না প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের আরেকটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে একটি শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
আজ অপ্রতিম। কাল অন্য কোনো অপ্রতিম যেন না হয়।
একটি মোবাইল ফোনের মূল্য যদি একটি শিশুর জীবনের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তাহলে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? প্রযুক্তি আমাদের হাতে এসেছে, কিন্তু মানুষের জীবন ও মানবিকতার মূল্য কি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে?
একটি শিশুকে হারানোর পর আমরা কয়েক দিন উত্তেজিত থাকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিই। বিচার চাই। মোমবাতি জ্বালাই। মানববন্ধন করি। তারপর নতুন কোনো খবর আসে। পুরোনো খবর চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু অপ্রতিমের মায়ের কাছে কোনো ‘নতুন খবর’ নেই।
তার কাছে প্রতিটি দিন একই দিনের পুনরাবৃত্তি ছেলে নেই।
একটি ঘর আছে। একটি বিছানা আছে। হয়তো স্কুলের বই আছে। পোশাক আছে। প্রিয় জিনিসপত্র আছে। দেয়ালে স্মৃতি আছে। কিন্তু যে শিশুটি এসবের প্রাণ ছিল, সে নেই।
এই ‘নেই’ শব্দটির কোনো প্রতিশব্দ নেই।
অপ্রতিমের বাবা-মায়ের জন্য সময় হয়তো আর কখনো স্বাভাবিক হবে না। আত্মীয়স্বজন সান্ত্বনা দেবেন। বন্ধুরা পাশে দাঁড়াবেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সহমর্মিতা জানাবেন। কিন্তু রাত গভীর হলে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, তখন একটি মায়ের মনে হয়তো একটাই প্রশ্ন ঘুরবে আমার সন্তানকে কেন ফিরিয়ে দেওয়া হলো না?
সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু অপ্রতিমের পরিবার চায় না। উত্তর চায় সমাজও।
কারণ হত্যাকারী যদি ধরা না পড়ে, অপরাধী যদি বিচারের বাইরে থেকে যায়, তাহলে ভয় শুধু একটি পরিবারে থাকে না ভয় ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি পরিবারে।
আজ যে মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, তিনি যেন নিশ্চিন্তে বলতে পারেন আমার সন্তান বিকেলে বাড়ি ফিরবে।
আজ যে বাবা তার সন্তানকে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতে দিচ্ছেন, তাঁর যেন মনে না হয় ফিরে আসবে তো?
একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার উঁচু ভবন নয়, তার প্রযুক্তি নয়, তার অর্থনীতি নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয় সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে।
অপ্রতিমের হত্যার তদন্ত তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর হওয়া জরুরি। কোনো নির্দোষ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার প্রকৃত অপরাধীও যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারেন। তদন্তে প্রযুক্তিগত প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের অবস্থান, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য সবকিছুর যথাযথ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পরিবারের জন্যও প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা।
কারণ অপ্রতিমকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
কিন্তু সত্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আর এমন হত্যাকাণ্ড যেন আরেকটি পরিবারকে সারাজীবনের কান্নায় ডুবিয়ে না দেয় সেই ব্যবস্থা করা সম্ভব।
অপ্রতিম হয়তো আর কোনোদিন তার মায়ের কাছে ফিরে আসবে না। স্কুলের ইউনিফর্ম পরে দরজায় দাঁড়াবে না। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে না। পরীক্ষার ফল নিয়ে আনন্দ করবে না। মায়ের কাছে আবদার করবে না।
কিন্তু তার মৃত্যু যেন বৃথা না যায়।
তার মৃত্যু আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলুক।
একটি শিশুর জীবনের মূল্য যেন একটি মোবাইল ফোনের চেয়েও অসীম এই সত্য যেন আমরা আবার মনে করি।
আর অপ্রতিমের মায়ের কান্না যেন কেবল একটি পরিবারের কান্না হয়ে না থাকে; সেটি যেন একটি সমাজের বিবেকের কান্না হয়ে ওঠে।
কারণ হত্যার ক্ষত একদিন শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের বুকের শূন্যতা শুকায় না।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের মামলা নয় এটি আমাদের নিরাপত্তা, মানবিকতা, আইন ও বিবেকের সামনে দাঁড় করানো একটি কঠিন প্রশ্ন।
অপ্রতিমের মা যে প্রশ্ন করেছেন—‘আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’ এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো আদালত দিতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ ও ন্যায়বিচার অন্তত এটুকু নিশ্চিত করতে পারে অপ্রতিমের মৃত্যুর সত্য যেন চাপা না পড়ে, আর তার পরিবারের কান্না যেন ন্যায়বিচারের দরজায় গিয়ে থেমে না যায়।