দেশে গ্যাস সংকট সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ বেড়েছে, স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ হিসাবে, দেশে গ্যাসক্ষেত্র ও এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৭৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে মোট সক্ষমতা ৩ হাজার ৮৫৪ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ সক্ষমতার ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে; প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২৭৭ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।
পেট্রোবাংলার ২১–২২ সেপ্টেম্বরের দৈনিক গ্যাস ও কনডেনসেট উৎপাদন ও বিতরণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এর কয়েক দিন আগেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র পাওয়া যায়। ১৩–১৪ সেপ্টেম্বর দেশে গ্যাসের মোট উৎপাদন ও আরএলএনজি সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। চার দিনের ব্যবধানে ১৬–১৭ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডিতে ওঠে—অর্থাৎ প্রায় ২৬১ এমএমসিএফডি বা ১১ শতাংশ বৃদ্ধি।
সাম্প্রতিক এই উন্নতির প্রধান উৎস দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র নয়, এলএনজি। ১৩–১৪ সেপ্টেম্বর আরএলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল ৭৩১ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি। ১৬–১৭ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ৯৮২ দশমিক ৯ এমএমসিএফডিতে ওঠে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। বিপরীতে একই সময়ে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি।
এলএনজি সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংকটের তীব্রতাও কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক গ্রাহকেরা আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ বাড়ার কথা জানিয়েছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কমেছে। শিল্পকারখানায়ও সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতির কথা জানিয়েছেন।
তবে এই উন্নতি এখনো সারাদেশে সমান নয়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর অনেক শিল্পকারখানায় অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় কম চাপেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে বলে শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। কোনো কোনো কারখানায় অনুমোদিত ১০–১৫ পিএসআইয়ের বিপরীতে ২–৩ পিএসআই চাপ পাওয়ার কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের মোট প্রবাহ সংকট-পূর্ব অবস্থায় ফিরলেও গ্রাহক পর্যায়ে সেই স্বস্তি এখনো পুরোপুরি পৌঁছেনি।
বর্তমানে দেশের ১১৯টি উৎপাদনশীল কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের ৪৪টি কূপের সক্ষমতা ৮৫১ এমএমসিএফডি হলেও উৎপাদন হয়েছে ৪৮২ এমএমসিএফডি। সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের ১৭টি কূপের সক্ষমতা ১৪৩ এমএমসিএফডির বিপরীতে উৎপাদন ১৩৯ দশমিক ২ এমএমসিএফডি। বাপেক্সের ১৫টি কূপের সক্ষমতা ১৪৫ এমএমসিএফডি, উৎপাদন ১০২ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির ৪৩টি কূপের সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ এমএমসিএফডির বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৮৭২ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি।
অন্যদিকে এলএনজি থেকে দৈনিক সরবরাহ হয়েছে ৯৮০ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি। এ খাতে সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার পেছনে এলএনজির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
গ্যাস সংকটের এই সাম্প্রতিক উন্নতি মূলত জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া সংকট থেকে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ফল। ওই সময় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়েছিল। পরে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল ধীরে ধীরে চালু হওয়া এবং দুই টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ সংকট-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি ফিরে আসে।
তবে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা ও সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। আগস্টে দেশে গ্যাসের গড় সরবরাহ নেমে এসেছিল ২ হাজার ২৩৫ এমএমসিএফডিতে, যেখানে সরকারি হিসাবে চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ এমএমসিএফডি।
ফলে সাম্প্রতিক সরবরাহ বৃদ্ধিতে আপাতত কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও গ্যাস খাতে স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন না বাড়িয়ে এলএনজিনির্ভর সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানির ওপর নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে।