হাসপাতালেই ছড়াচ্ছে হাম, একই জায়গায় হাম-ডেঙ্গু-নবজাতক

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রেহাই মিলছে না শিশুদের। একই জায়গায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুদের। এমনকি কয়েক দিনের নবজাতককেও থাকতে হচ্ছে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের খুব কাছাকাছি। শয্যা সংকটে ওয়ার্ডের বাইরে করিডোরে চলছে স্যালাইন, অক্সিজেন ও অন্যান্য চিকিৎসা।

গত সোমবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ৬০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডটিতে রোগী ভর্তি ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ জন। ওই দিন বিকেলের শিফটে প্রায় ২৭০ শিশুর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র দুজন মেডিকেল অফিসার ও তিনজন নার্স।

৮ তলায় শিশু ওয়ার্ডের নবজাতক ওয়ার্ড-১-এর সামনে পাঁচ ঘণ্টা ধরে বসে ছিলেন মো. মাইনুদ্দীন ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের কোলে আট মাসের শিশু জাবের। শিশুটির শরীরে র‌্যাশ ও শ্বাসকষ্ট থাকায় পরিবারের সন্দেহ, সে হামে আক্রান্ত। কিন্তু ওয়ার্ডে কোনো শয্যা না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা করিডোরেই অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের।

জাবেরের বাবা একবার নার্সদের কক্ষে, আরেকবার চিকিৎসকদের কক্ষে গিয়ে সন্তানের জন্য একটি শয্যার আকুতি জানিয়েছেন। প্রতিবারই তাঁকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এদিকে শ্বাসকষ্টে শিশুটি মায়ের কোলে ছটফট করলেও দীর্ঘ সময় তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, জাবের যেখানে বসে ছিল, তার আশপাশ দিয়েই যাতায়াত করছিল একদিনের নবজাতক কোলে থাকা মা-বাবারা। ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুরাও আসছিল সেখানে। ফলে হামের সম্ভাব্য রোগীর সঙ্গে নবজাতকসহ অন্য শিশুদের সহজেই সংস্পর্শ ঘটছিল।

একই ওয়ার্ডের অন্য পাশে ইমার্জেন্সি অক্সিজেন বেডে স্যালাইন চলছিল তিন বছরের ডেঙ্গু আক্রান্ত ইয়ামিনের। চার ঘণ্টা ধরে সেখানে বসেছিলেন তার মা শারমিন আক্তার। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে সেখানে রেখে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল।

ইয়ামিনের মাত্র দেড় থেকে দুই ফুট দূরেই পাঁচ দিনের একটি নবজাতককে কোলে নিয়ে বসেছিলেন তার দাদি পারভীন বেগম। শিশুটির হাতে দুই ঘণ্টা ধরে ক্যানোলা দিয়ে স্যালাইন চলছিল। ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় বাইরে বসিয়েই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল বলে জানান তিনি।

মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬০ শয্যার ওয়ার্ডটিতে নিয়মিতই ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী থাকে। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে করিডোর, ওয়ার্ডের প্রবেশপথ কিংবা ইমার্জেন্সি বেডেও শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা. নুশরাত জাহান বলেন, বিকেলের শিফটে দুজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন। ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশু ভর্তি আছে।

তিনি বলেন, হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। ডেঙ্গু ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা। ফলে নির্ধারিত ওয়ার্ডের বাইরে রোগীদের রাখতে হচ্ছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্য রোগীদের সংস্পর্শে না আসতে অভিভাবকদের বলা হলেও অনেক সময় তা মানা হচ্ছে না।

এতে হাসপাতালের ভেতরেই এক রোগ থেকে অন্য রোগে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, মুগদা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও শয্যার সংকট তীব্র। কুমিল্লার হোমনা থেকে তিন বছরের বাইজিদকে নিয়ে এসে এক দিন পার হলেও শয্যা পাননি বাবা জিলানি। শেষ পর্যন্ত ওয়ার্ডের বাইরের এক কোণে মেঝেতে সাদা কাপড় বিছিয়ে শিশুকে রাখতে হয়েছে। মাথার ওপরে কোনো ফ্যানও ছিল না। ছেলের গরম লাগায় মা শিল্পী খানম হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন।

আরেক শিশু আইরিনকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চার দিন মেঝেতে থাকতে হয়েছে বলে জানান তাঁর বাবা মাসুদ আহমেদ। পরে শয্যা পেলেও ওয়ার্ডের অতিরিক্ত গরমে শিশুটির অস্থিরতা বেড়ে যায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত আইরিনের শরীরে র‌্যাশ দেখা দিয়েছে এবং প্লাটিলেটও কমেছে বলে জানান বাবা।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, ঢাকার বাইরে থেকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক শিশু আসছে। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হলেও অনেক পরিবার ঢাকায় চলে আসায় মুগদা হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

হাম ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের রোগীদের একই জায়গায় রাখার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার বলেন, শয্যা সংকটের কারণে একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রাখার ফলে হাসপাতালেই হামের সংক্রমণ হচ্ছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক। তাই রোগীদের আলাদা রাখা বা আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি।

সম্প্রতি চারটি হাসপাতালের ২০০ হাম আক্রান্ত শিশু ও ১০০ মায়ের তথ্য নিয়ে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের করা গবেষণার তথ্যও উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত হয়েছে।

অর্থাৎ যে হাসপাতালে রোগী সুস্থ হওয়ার জন্য আসছে, পর্যাপ্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকলে সেই হাসপাতালই হয়ে উঠছে নতুন সংক্রমণের ক্ষেত্র।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু ও হামের রোগী অনেক বেশি হওয়ায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। এর ফলে হাসপাতালেই শিশুরা হাম, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। হাসপাতালগুলোতে জনবলের সংকটও রয়েছে। এ কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।

তবে হাসপাতালের শয্যা ও জনবল সংকটের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে। একই জায়গায় হামের সম্ভাব্য রোগী, ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু এবং কয়েক দিনের নবজাতককে রাখার পরিস্থিতিতে চিকিৎসা দিতে গিয়ে এক রোগী থেকে অন্য রোগীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা যদি হাসপাতালেই নতুন সংক্রমণের শিকার হয়, তাহলে রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের এই সংকট মোকাবিলাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ