কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। কালের স্রোত তাঁদের শরীরকে মুছে দেয়, কিন্তু তাঁদের কর্ম, চিন্তা, আদর্শ ও মানবকল্যাণের স্বপ্নকে মুছে দিতে পারে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অংশ, মানুষের ভালোবাসার অংশ, একটি জনপদের আত্মপরিচয়ের অংশ। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী তেমনই এক মহীয়সী নারী।
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ১৯০৩ সালের এই দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম অগ্রগামী নারী, শিক্ষানুরাগী, সাহিত্যিক, সমাজসেবী ও জমিদার নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। তাঁর মৃত্যুর ১২৩ বছর পূর্ণ হলো। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা।
উনিশ শতকের সেই সময়টি আজকের মতো ছিল না। নারীর শিক্ষা, স্বাধীন চিন্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ ছিল নানা বাধা ও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সেই সময় কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও থেকে একজন নারী শুধু নিজের জন্য জ্ঞানের আলো গ্রহণ করেননি, সেই আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন অন্য নারীদের মধ্যেও। তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেসা।
১৮৩৪ সালে জন্ম নেওয়া ফয়জুন্নেসা ছিলেন সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও গৃহশিক্ষার মাধ্যমে তিনি বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন এবং নিজের আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন ‘রূপজালাল’।
নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর উদ্যোগ ছিল সময়ের তুলনায় অসাধারণ। ১৮৭৩ সালে মেয়েদের জন্য তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্যোগ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ঘটনা ছিল না; এটি ছিল এমন এক সময়ে সামাজিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, যখন মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েই নানা ধরনের বাধা ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাকসাম ও কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০২৬ সালেও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষা কার্যক্রম তাঁর উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করছে। ফয়জুন্নেসা বুঝেছিলেন একটি সমাজকে বদলাতে হলে তার নারীকে শিক্ষিত করতে হবে। শিক্ষা কেবল ব্যক্তিকে বদলায় না; বদলে দেয় একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম, শেষ পর্যন্ত একটি সমাজকে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তিনি চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৮৯৩ সালে পশ্চিমগাঁওয়ে নারীদের জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবার উদ্যোগ তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় বহন করে।
তাঁর জীবন ছিল আত্মশিক্ষারও এক অনন্য উদাহরণ। যে সমাজে নারীর জ্ঞানচর্চার পরিসর ছিল সংকীর্ণ, সেই সমাজেই তিনি বই পড়েছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন এবং নিজের ভাবনাকে কলমের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রূপজালাল’। ঢাকা থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে। গবেষণামূলক আলোচনায় ‘রূপজালাল’-কে বাংলা ভাষায় মুসলিম নারীর সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
একজন নারী যখন কলম হাতে নেন, তখন তিনি শুধু একটি বই লেখেন না অনেক সময় তিনি তাঁর সময়ের প্রচলিত সীমারেখাকেও অতিক্রম করেন। ফয়জুন্নেসার সাহিত্যচর্চার মধ্যেও ছিল সেই আত্মপ্রকাশের সাহস।
তাঁর জীবনকে যদি একটু গভীরভাবে দেখি, তাহলে দেখতে পাই তিনি কেবল জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিক্ষাব্রতী। কেবল সাহিত্যিক ছিলেন না ছিলেন সমাজহিতৈষী। কেবল বিত্তশালী নারী ছিলেন না—নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন।
১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘নওয়াব’ উপাধি দেওয়া হয়। তাঁর সামাজিক অবস্থান ও সম্পদ তাঁকে শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদা দেয়নি; সেই অবস্থানকে তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
সম্পদ মানুষের ব্যক্তিগত ভোগের জন্য যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনি মানুষের কল্যাণেও ব্যয় করা যায়। ফয়জুন্নেসা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।
শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তা ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি তাঁর সময়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, জাতীয়করণ হয়েছে কিংবা নতুন রূপ পেয়েছে; কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে তাঁর নাম ও স্মৃতি এখনও জড়িয়ে আছে।
তাঁর কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও এসেছে। ২০০৪ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তবে একজন মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল পুরস্কার বা উপাধিতে হয় না। তাঁর কাজ কতটা সময়কে অতিক্রম করে মানুষের জীবনে থেকে গেছে, সেটিই বড় কথা।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ফয়জুন্নেসার উত্তরাধিকারকে দেখলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত পশ্চিমগাঁওয়ের নবাববাড়ি এখন সংরক্ষিত পুরাকীর্তির অংশ। ২০১৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর বাড়িটির সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে জাদুঘর ও আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এটি নিছক একটি পুরোনো বাড়ি সংরক্ষণের বিষয় নয়। একটি স্থাপনা সংরক্ষণ মানে একটি সময়কে সংরক্ষণ করা। একটি ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। একটি নারীর জীবনসংগ্রাম, জ্ঞানচর্চা ও সমাজসেবার স্মৃতিকে দৃশ্যমান করে রাখা।
২০২৬ সালের জুনেও দেখা গেছে, নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ৫৫০ শিক্ষার্থী ও ৩০ শিক্ষক-শিক্ষিকা তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নবাববাড়ি পরিদর্শন করেছেন। অর্থাৎ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরও তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার বিষয় হয়ে আছে।
আজকের বাংলাদেশে নারীশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান, ব্যবসা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। এই পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে নওয়াব ফয়জুন্নেসার মতো অগ্রপথিকদের কথা স্মরণ করা জরুরি।
কারণ পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। কেউ প্রথম প্রশ্ন করেন। কেউ প্রথম দরজা খুলে দেন। কেউ প্রথম প্রদীপটি জ্বালান। পরবর্তী প্রজন্ম সেই আলোকে আরও দূরে নিয়ে যায়। ফয়জুন্নেসা ছিলেন সেই প্রদীপ জ্বালানো মানুষদের একজন। তাঁর জীবন আমাদের সামনে আজও একটি প্রশ্ন রেখে যায় আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি, যে সম্পদ অর্জন করেছি, যে সামর্থ্য পেয়েছি, তা সমাজের জন্য কতটা কাজে লাগাচ্ছি?
ফয়জুন্নেসার জীবনের উত্তর ছিল তাঁর কাজেই। তিনি বুঝেছিলেন, একটি বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়; এটি ভবিষ্যতের দরজা। একটি চিকিৎসাকেন্দ্র শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়; এটি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি। একটি বই শুধু কাগজের পৃষ্ঠা নয়; এটি মানুষের চিন্তাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। তাই তাঁর জীবন আজও প্রাসঙ্গিক। আজ আমরা যখন নারীশিক্ষা, নারীর মর্যাদা, সামাজিক সমতা এবং মানবিক অধিকারের কথা বলি, তখন ইতিহাসের এই মহীয়সী নারীদের স্মরণ করা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়াই হতে পারে প্রকৃত শ্রদ্ধা। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পশ্চিমগাঁওয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দশগম্বুজ মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। কিন্তু সত্যিই কি তিনি চলে গেছেন? না। যে নারী একটি সময়ের অন্ধকারে মেয়েদের হাতে শিক্ষার আলো তুলে দেন, তাঁর মৃত্যু হয় না। যে নারী নিজের সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন, তাঁর মৃত্যু হয় না। যে নারী সমাজের প্রচলিত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কলম হাতে নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেন, তাঁর মৃত্যু হয় না।
তিনি বেঁচে থাকেন বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। তিনি বেঁচে থাকেন বইয়ের পাতায়। তিনি বেঁচে থাকেন শিক্ষার্থীদের স্বপ্নে। তিনি বেঁচে থাকেন ইতিহাসের স্মৃতিতে। তিনি বেঁচে থাকেন সেইসব মানুষের কাজে, যারা বিশ্বাস করেনজ্ঞান ও মানবসেবা মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। আজ তাঁর ১২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শুধু ফুলেল শ্রদ্ধা জানালেই হবে না। প্রয়োজন তাঁর আদর্শকে নতুন করে স্মরণ করা। প্রয়োজন তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা। প্রয়োজন তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে তুলে ধরা।
কারণ ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়। ইতিহাস ভবিষ্যতের পথও দেখায়। নওয়াব ফয়জুন্নেসা আমাদের শিখিয়েছেনমানুষের জন্য কিছু করার সবচেয়ে বড় সময় হলো যখন সেই কাজটি কঠিন।
তিনি কঠিন সময়েই কাজ করেছিলেন। তাই ১২৩ বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধায়। আজও তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। আজও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে নতুন প্রজন্ম যায়। আজও তাঁর লেখা ‘রূপজালাল’ সাহিত্য ও নারী ইতিহাসের আলোচনায় ফিরে আসে। আর আজও তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়একজন মানুষের সামর্থ্য যদি মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে সেই জীবন সময়কে অতিক্রম করতে পারে। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীআপনি নেই, কিন্তু আপনার আলো আছে। আপনার শরীর নেই, কিন্তু আপনার কর্ম আছে। আপনার কণ্ঠ নেই, কিন্তু আপনার আদর্শ আজও কথা বলে। আপনার স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। গভীর শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা।