পিছু ছাড়ছে না আতঙ্ক

সড়কে মৃত্যুর ঝুঁকি, ছিনতাই-ডাকাতির ভয়; বাজার দরে আগুন, সঙ্গে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের চাপ

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঘর থেকে বের হলেই অনিশ্চয়তা। সড়কে দুর্ঘটনার ভয়, রাতে ছিনতাই-ডাকাতির আতঙ্ক, কোথাও গুজব বা সন্দেহের জেরে মব সন্ত্রাস। ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, জ্বালানি তেলের মূল্য, গ্যাসের সংকট ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় চাপে ফেলছে পরিবারগুলোর বাজেট। নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই বহুমুখী সংকটে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে স্থায়ী উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়, আর স্বস্তিই বা কোথায়?

সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জননিরাপত্তা সংকটে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ৫৬১ জন আহত হয়েছেন। এর আগের এপ্রিলেও ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত এবং ৭০৯ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ প্রতিদিনই দেশের সড়কে একাধিক পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, যানবাহনের ফিটনেস ঘাটতি, অনিয়মিত ওভারটেকিং, সড়কের নকশাগত সমস্যা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। মোটরসাইকেল ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। হেলমেট ব্যবহারে অনিয়ম, চালকের প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে তরুণদের একটি অংশ প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকিতে থাকছেন।

সড়কের পাশাপাশি রাতের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে গণপরিবহন থেকে নামার পর নির্জন সড়ক, অন্ধকার গলি কিংবা বাসাবাড়ির কাছাকাছি এলাকায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কিছু ঘটনায় শারীরিক হামলার অভিযোগও ওঠে। নারী, একাকী পথচারী, রাতের কর্মজীবী ও রাইডশেয়ার ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তবে অপরাধের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নয়, পুলিশের মামলা, সাধারণ ডায়েরি ও তদন্তের তথ্যকে ভিত্তি করা জরুরি। একই সঙ্গে অনেক ভুক্তভোগী মামলা বা অভিযোগ না করায় সরকারি পরিসংখ্যানে অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি মব সন্ত্রাস। কোনো ব্যক্তিকে চোর, ছিনতাইকারী বা অপরাধী সন্দেহ করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই গণপিটুনি দেওয়া কিংবা হত্যা আইনের শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি। অভিযোগ সত্য হলেও বিচার করার অধিকার আদালতের, জনতার নয়। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপরাধ একজন মানুষের জীবন মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অসম্পূর্ণ ভিডিও ও যাচাই না করা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

নিরাপত্তার এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আয় একই থাকলেও খাবার, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়তে থাকে। ফলে মধ্যবিত্তের একটি অংশকে জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের সংকট আরও গভীর।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের জুন থেকে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনের খরচ বাড়ে না; পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বাজারজাতকরণেও তার প্রভাব পড়ে। উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই সেই বোঝা বহন করতে হয়।

গ্যাস সংকটও মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ পড়ে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, আর আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার সময়সূচিও বিঘ্নিত হয়। উৎপাদন কমলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও কর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরে টার্মিনালের একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে এ ঘটনা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। বড় অবকাঠামোগত কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত জাতীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ও মানুষের স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে। ২০২৬ সালে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রায় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট গড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শুধু মাসিক বিল বাড়ে না; দোকান, কারখানা, অফিস, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার খরচেও তার প্রভাব পড়ে। একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে বাড়তি মূল্য দিয়ে গ্রাহক কতটা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন উঠছে।

একজন চাকরিজীবী পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ চলে যায় বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের পেছনে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়লে পরিবারের হাতে সঞ্চয়ের অর্থ কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটি ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ। সাধারণ মানুষের ভাষায় মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন শেষ হয়ে যাওয়া।

নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট একে অন্যকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনায় একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে শুধু একটি প্রাণই হারায় না; একটি পরিবারের আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ছিনতাইয়ে অর্থ হারানো নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা। মব সহিংসতায় কেউ নিহত হলে তার পরিবার স্বজন হারানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও হারায়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে একই পরিবারকে কম খাবার, কম চিকিৎসা, কম শিক্ষা ব্যয় কিংবা কম সঞ্চয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান পরিবর্তন, লাইসেন্স ও ফিটনেস পরীক্ষায় কঠোরতা, গতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত চালক নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো সংস্কার জরুরি। ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, পুলিশের টহল ও দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি গুজব ও যাচাই না করা তথ্যের বিস্তার ঠেকাতেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ও মূল্যতথ্য প্রকাশের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের সময় শুধু উৎপাদন বা আমদানি ব্যয় নয়, সাধারণ মানুষের আয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

দেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তার আগে চায় নিরাপদ জীবন। রাস্তায় বেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়, রাতে কাজ শেষে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে চায়, গুজবের কারণে যেন কেউ জনতার হাতে প্রাণ না হারায় এই নিশ্চয়তা চায়। বাজারে গিয়ে যেন মাসের আয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মেলাতে পারে, সেটিও চায়। মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয় নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ জনজীবন, সহনীয় বাজারদর এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি-বিদ্যুৎ। কিন্তু বাস্তবতা যখন একসঙ্গে এতগুলো চাপ তৈরি করে, তখন প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে স্বস্তি আসবে কবে?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ