গ্যাস নেই। বাড়তি খরচে কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার। থাকেনা বিদ্যুৎ। বাজারে গেলে আগের তুলনায় বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য। আয় না বাড়লেও খরচ কমছে না, বরং একের পর এক নতুন ব্যয় যোগ হচ্ছে সংসারে।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনামূলক উচ্চমূল্য—তিন দিকের এই চাপ একসঙ্গে এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার স্বস্তি খুব একটা অনুভূত হচ্ছে না। আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে jনেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। কিন্তু পণ্যের দাম কমেনি; দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বড় একটি অংশকে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহের সংকট নতুন করে তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গিয়েছিল। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়।
তবে সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ হিসাবে পরিস্থিতির পরিসর আরও স্পষ্ট হয়েছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এবং এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পেলে উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। একই সময়ে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরও বড় হয়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়িতে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক পরিবারকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে রান্নার জন্য সিলিন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে মাসিক সংসার খরচে যুক্ত হচ্ছে নতুন ব্যয়।
মুগ্দা, মানিক নগরের একজন বাসিন্দা যিনি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলার প্রার্থী রকি দৈনিক প্রকৃতির সংবাদ কে বলেন, ‘সারাদিন মতিঝিলে অফিস করে বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নেব, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রায়ই বাসায় এসে দেখি গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। বার বার বিদ্যুৎ চলে যায়।’
একই এলাকার বাসিন্দা একজন গৃহীনি আমেনা বেগম আক্ষেপ করে দৈনিক প্রকৃতির সংবাদকে বলেন, ‘আগে শীতের সময় গ্যাসের সমস্যা হতো। এখন কোনো সময়ই ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎও দিনে রাতে কয়েকবার চলে যায়।’
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পকারখানাতেও এর চাপ পড়ছে। তবে শিল্প খাতের সংকটকে শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। অর্থসংকট, ব্যাংকঋণ, ক্রয়াদেশের চাপ, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিসহ একাধিক কারণে অনেক কারখানা বন্ধ বা উৎপাদন কমিয়েছে।
প্রথম ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী দৈনিক প্রকৃতির সংবাদকে বলেন, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২০ হাজার পোশাকশ্রমিক ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বিজিএমইএর হিসাবে, ৮০টি সদস্য কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিককে ছাঁটাই বা চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা পরে বন্ধ হয়ে যায়।
তবে এর চেয়েও বড় চিত্র উঠে এসেছে সংসদে দেওয়া তথ্যে। গত ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে ৪০২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য ১২০টি কারখানা।
কারখানা বন্ধের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, বিভিন্ন দেশের সংঘাত, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো একাধিক কারণের কথা সরকার ও শিল্প খাতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, গ্যাস সংকটের কারণে পোশাক কারখানা বন্ধ হচ্ছে—এমন খবরকে সম্প্রতি বিজিএমইএ’র দাবি, সংগঠনটি বলেছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট থাকলেও অনেক কারখানা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সংকটের পেছনে জ্বালানি সংকট একটি কারণ হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়।
মূল্যস্ফীতির সরকারি পরিসংখ্যানে কিছুটা স্বস্তির খবর থাকলেও সাধারণ ক্রেতার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ের ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে কয়েক বছর ধরে যে পণ্যগুলোর দাম বেড়ে গেছে, সেগুলো আগের দামে ফিরে আসছে না।
এ কারণেই বাজারে গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি পরিবহন, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জ্বালানির মতো খরচও পরিবারের বাজেটে চাপ তৈরি করছে।
সাধারণ মানুষের সংকটটা শুধু বাজারদরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাস না থাকলে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের ব্যয় যোগ হচ্ছে।
ফলে অনেক পরিবারকে ব্যয়ের ধরন বদলাতে হচ্ছে। কেউ বাজারের তালিকা ছোট করছেন, কেউ মাছ-মাংসের পরিমাণ কমাচ্ছেন, কেউ সন্তানদের অতিরিক্ত খরচ বন্ধ করছেন। আর যেসব পরিবারে কেউ চাকরি হারিয়েছেন, তাদের অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে বা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন বলেই আমাদেরকে জানান।
অর্থনীতির পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার খবর স্বস্তির হতে পারে। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে আসল হিসাব হলো—মাস শেষে আয় থেকে কত টাকা হাতে থাকছে। সেই জায়গায় যদি বাজার, জ্বালানি ও দৈনন্দিন ব্যয় কমে না আসে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মানুষের স্বস্তি ফিরতে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য—তিন দিকের চাপেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। এর কোনোটি সাময়িক, কোনোটি দীর্ঘদিনের; কিন্তু শেষ পর্যন্ত চাপটি পড়ছে একই জায়গায়—পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও জীবনযাত্রার মানে।
মানুষের প্রত্যাশা এখন খুব মৌলিক—ঘরে নিয়মিত গ্যাস-বিদ্যুৎ থাকবে, কাজের সুযোগ কমবে না এবং আয় না বাড়লেও অন্তত নিত্যদিনের খরচ আর বাড়বে না।