রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে সচিবালয়ের দিকে রওনা দিয়ে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সেখানে তাঁরা পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়েছেন। তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন।
গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে একদল শিক্ষার্থী সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় অবরোধ করেন। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আইয়ুব হোসেন বলেন, বেলা ২টা ৩৫ মিনিটের দিকে ৫০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আসেন। তাঁরা ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মতো সড়ক আটকে রাখেন। পরে তাঁরা সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছান বিকেল চারটার দিকে। সেখানে আগে থেকেই ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল পুলিশ। এখন শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন ও নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন।
শিক্ষা ভবনের সামনে থাকা এক আন্দোলনকারী নিজেকে রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেহেদী হাসান হামিম বলে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী তাঁর পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। প্রতিটি প্রশ্নপত্রে ভুল থাকছে। মন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা ভুল প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তাঁরা পূর্ণ নম্বর পাবেন, আর যাঁরা উত্তর করেননি, তাঁদের কী হবে? এভাবে আসলে একটা পরীক্ষা হতে পারে না। আমরা তাঁর পদত্যাগ চাই।’
অন্যদিকে বেলা একটার পর শিক্ষার্থীরা রাজধানীর উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন বলে নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার তারেক আহমেদ বেগ।
বেলা দেড়টার দিকে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনের সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এই অবরোধের ফলে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
অবরোধ চলাকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। অবরোধে অংশ নেওয়া একজন নিজের পরিচয় দেন সাহাজউদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইকরা ইসলাম ইতি বলে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী আমাদের ফার্মের মুরগি বলেছেন। আমরা কি মুরগি? সে জন্য আমরা তাঁর পদত্যাগ চাই।’
আরেক শিক্ষার্থী নিজেকে পরিচয় দেন ক্যামব্রিয়ান কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. মেহেদি হাসান বলে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আমরা লংমার্চ শুরু করছি।’ বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে এখানকার শিক্ষার্থীরা ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁরা পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ যান। পরে পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে উঠতে শুরু করেন।
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও প্রশ্নের মান নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে গতকাল দিনভর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত পৌনে ১০টার দিকে ঢাকায় একদল শিক্ষার্থী নতুন কর্মসূচি দিয়ে বিক্ষোভ শেষ করেন।নতুন কর্মসূচি সম্পর্কে গতকাল শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, আজকের নির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত না করলে বেলা তিনটা থেকে ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি পালন করা হবে।শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁর বক্তব্যের জন্য গতকাল সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘বিরূপ’ মন্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রামসহ ১৩ জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। এর মধ্যে ঢাকা, বরিশাল ও টাঙ্গাইলে মহাসড়ক অবরোধ এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করা হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেননি। তাঁদের দাবি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার অবসান না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত, যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাঁদের পরীক্ষা আবার নিতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে মন্তব্যের জন্য ক্ষমা না চাইলে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে।
বরিশাল
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আজ বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দুপুরের পর থেকে নগরের বিভিন্ন কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা নথুল্লাবাদ এলাকায় শিক্ষা বোর্ডের সামনে জড়ো হতে থাকেন। পরে পরীক্ষা শেষে বেলা দেড়টার দিকে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সেখানে যোগ দেন।
শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে প্রায় ১০ মিনিট ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বৃষ্টি শুরু হলে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে আবার শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে শিক্ষা বোর্ড এলাকার প্রবেশপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা দাবি আদায়ে অনড় থাকায় কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। এ সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা যায়।
বরিশাল বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাখাওয়াত হোসেন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বলেন, শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান করছেন। বরিশাল-ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক আছে।
রাজশাহীতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ বেলা দেড়টার দিকে নগরের তালাইমারী মোড়ে অবস্থান নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এই কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে তাঁরা সড়ক থেকে সরে যান। এ সময় তাঁরা ঘোষণা দেন, দাবি পূরণ না হলে বৃহস্পতিবার দুপুর দুই থেকে আবার অবরোধ কর্মসূচি শুরু হবে।
অবরোধকালে শিক্ষার্থীরা সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। তাঁরা রাস্তার ওপরে এক সারি ইট দিয়ে রাখেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, বৈরী আবহাওয়া ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা পরীক্ষার্থীরা অবর্ণনীয় ভোগান্তির মধ্য দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ওই বোর্ডে প্রায় ১১ হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আকস্মিক এই মহাসড়ক অবরোধের ফলে রাস্তার দুই পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দূরপাল্লার যাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘটনাস্থলে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তবে মুমূর্ষু রোগীদের বহনকারী কোনো গাড়ি দেখলে তাঁরা তাঁদের যাওয়ার জন্য রাস্তা করে দেন।
কুষ্টিয়া
একই দাবিতে কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর রেলগেটের ট্রাফিক মোড়ে কুষ্টিয়া–ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়া–ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বেলা দেড়টার দিকে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী প্রথমে মহাসড়কের পাশে জড়ো হন। বেলা পৌনে দুইটার দিকে তাঁরা মহাসড়ক অবরোধ করে স্লোগান দিতে থাকেন। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁরা মহসড়ক থেকে সরে যান।
কুষ্টিয়া সেন্ট্রাল কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিম সিদ্দিকী বলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা যেসব দাবি তুলেছেন, সব কটি মেনে নিতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। শিক্ষকেরা ঠিকমতো ক্লাস নেন কি না, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তা না করে আগেই পরীক্ষা কঠোর করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে সবকিছু হচ্ছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন।
রংপুর
এইচএসসি পরীক্ষা শেষে আজ দুপুরে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে শহরের বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে এসে শেষ হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বেলা তিনটার দিকে মহানগর কোতোয়ালি থানার সামনে যান। সেখানে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। পরে সেখান থেকে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আবারও শিক্ষার্থীরা পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে চলে যান।
বিকেলে সাড়ে ৫টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল শেষে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় গিয়ে ডিউটি অফিসার আর্জিনা খাতুনের হাতে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে এইচএসসি ২০২৬ ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মাহদী হাসান (অনিক)।
এতে উল্লেখ করা হয়, ১৪ জুলাই জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষামন্ত্রীসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের নির্দেশে পুলিশ হামলা চালায় এবং আন্দোলনকারীদের গালিগালাজ করে। এতে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে নতুন কারিকুলাম ও সাম্প্রতিক শিক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতিসাধন হয়েছে।
এ সম্পর্কে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা থানায় এসেছিলেন এবং আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে থানায় একটি অভিযোগ দেওয়ার কথা শুনেছি।’
গাইবান্ধা
এ ছাড়া গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের চৌমাথা মোড়ে আজ বেলা আড়াইটার দিকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমবেত হন। পরে সেখান থেকে তাঁরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এটি উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে শিক্ষার্থীরা উপজেলা সদরের চৌমাথা মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানানো হয়।
সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ শহরের ইলিয়ট সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে স্টেশন বাজার এলাকায় এসে শেষ হয়। এখানে কিছু সময় সড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন।