দুই হাতের কবজি নেই, স্বপ্ন পূরণে পায়ে লিখে পরীক্ষা দিচ্ছে কলি

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। হাত ছোট ও বাঁকা। অন্য আর দশজনের মতো স্বাভাবিক নয় তার জীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর অভাব অনটনের সংসারে বেড়া ওঠা। তবুও পড়ালেখা চুকিয়ে দেয়নি। বরং অদম্য ইচ্ছেশক্তি আর স্বপ্ন পূরণের প্রবল আশা তাকে পৌঁছে দিয়েছে উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার চূড়ায়। বলছি শিক্ষার্থী কলি রানীর কথা।

কলি রানী উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নে গদাই গ্রামের রুপালী রানীর মেয়ে। দুই পায়ে হাঁটাচলা করতে পারলেও বাহু থেকে দুই হাতের কবজি নেই। কিন্তু প্রতিবন্ধকতা তাকে দমাতে পারেনি।

দুপুরে কাউনিয়া মহিলা কলেজ পরীক্ষাকেন্দ্রে বাংলা প্রথমপত্র দিয়ে শুরু হয় তার এইচএসসি পরীক্ষা। সেখানে পরীক্ষার কক্ষে সবাই যখন বেঞ্চে বসে একমনে প্রশ্নের উত্তর লিখে যাচ্ছেন খাতায়। তখন তাদেরই পাশে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন কলি রানী। তাকে দেওয়া হয় ছোট ব্রেঞ্চ। আর সেখানে বসে মনোযোগ সহকারে পা দিয়ে উত্তর লিখে সে। দূর থেকে একনজরে দেখলে কলি রানীকে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে শারীরিক প্রতিবন্ধী।

জানা গেছে, পরিবারের সহযোগিতা আর প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে কলি রানী। পঞ্চম শ্রেণিতে সে পায়ে লিখে এ গ্রেড পেয়েছিল। এসএসসিতেও উত্তীর্ণ হয়েছে কৃতিত্বের সঙ্গে। পা দিয়ে চালাতে পারেন কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন। বাবাহীন পরিবারের হাল ধরতে তার স্বপ্ন পড়ালেখা শিখে বিসিএস ক্যাডার হবার। সে ভালো গানও গাইতে পারে, গান গেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক পুরষ্কারও পেয়েছে।

তিনি আরও জানান, কলি রানী ডান পা দিয়ে আস্তে আস্তে লেখা শুরু করে। ধীরে ধীরে লিখতে লিখতে দ্রুত গতিতে লেখার কৌশল আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি ছোট বোনের স্বপ্ন পূরণের জন্য সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন।

পরীক্ষার্থী কলি রানী জানান, অনেক বড় হবার স্বপ্ন তার। পড়ালেখা শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চান। বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখে সে। বাবার শূন্যতা আর সংসারের অভাব মোচনে নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বাধা মনে হলেও ইচ্ছে শক্তিটাই বড় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে বলেও সে জানায়।

কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্রসচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষা কক্ষে অন্যদের সাথে কলি রানী পা দিয়ে খাতায় লিখছে। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় কেন্দ্রের নিয়ম মেনে তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে তার এই স্বপ্নের পথচলায় সফলতা কামনা করি।

কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীকে দমাতে পারেনি। তার ইচ্ছেশক্তি, মনোবল ও সাহস অন্যদের অনুপ্রেরণার বার্তা দেয়। আমরা চাই তার অদম্য অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায়। সে যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। উপজেলা প্রশাসন কলি রানীর পাশে থাকবে।

প্রসঙ্গত, এ বছর দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২১৩টি কেন্দ্রে রংপুর বিভাগের আট জেলার ৭৩৩টি কলেজের ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৬ পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এরমধ্যে রংপুরের আট উপজেলায় ৪১টি কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে ২৪ হাজার ৩৩২ জন পরীক্ষার্থী।

এছাড়াও জেলার ৮ উপজেলায় বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১০টি কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষায় ২ হাজার ১৫২ জন এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (বিএমটি/বিএম/এইচএসসি-ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১৬টি কেন্দ্রে ৫ হাজার ২৪৮ জন পরীক্ষা দিচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ