দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্য, তবুও সংকটে ধুঁকছে চট্টগ্রাম কলেজ

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬

১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন ও গৌরবময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কলেজ। দেড় শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ আজও হাজারও শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা। তবে, এই বর্ণিল ইতিহাসের আড়ালে বর্তমানে শিক্ষক স্বল্পতা ও আবাসন সমস্যার মতো নানাবিধ সংকটে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি। সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে এখন ব্যাহত হচ্ছে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৩৬ সালে ‘চট্টগ্রাম জেলা স্কুল’ হিসেবে এর প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে ‘রেড বিল্ডিং’-এ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে এটি ‘চট্টগ্রাম কলেজ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ জে. সি. বোস ছিলেন কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। ১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভের পর এখানে ডিগ্রি কোর্স চালু হয়। পরবর্তী দুই দশকে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ইংরেজি, দর্শন ও অর্থনীতি বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ছাত্রাবাস।

পাকিস্তান আমলের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় এসে কলেজটির একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৬২ সালে নতুন করে প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও পরিসংখ্যান বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়, যা উচ্চশিক্ষার বিস্তারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম কলেজ দেড় শতাব্দী ধরে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রাখছে। এই বিদ্যাপীঠ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন আহমদের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরা গড়ে উঠেছেন। তবে বর্তমানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ঐতিহ্যের বিপরীতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে

বর্তমানে চট্টগ্রাম কলেজের উচ্চমাধ্যমিক এবং অনার্স ও মাস্টার্স স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।

দেড় শতাব্দীর এই দীর্ঘ পথচলায় চট্টগ্রাম কলেজ অসংখ্য কবি, লেখক, গবেষক ও রাজনীতিবিদকে আলোকিত করেছে। এই বিদ্যাপীঠ থেকেই গড়ে উঠেছেন অনেক কৃতী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এই গুণীজনদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— একুশের প্রথম কবিতার কবি মাহবুব-উল আলম চৌধুরী, প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তক সলিমুল্লাহ খান এবং নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়াও বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মতো ব্যক্তিত্বরাও এই কলেজেরই প্রাক্তনী।

শিক্ষক ও আবাসন সংকট

চট্টগ্রাম কলেজে বর্তমানে কলা, সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান এবং জীবন ও ভূবিজ্ঞান— এই চার অনুষদের অধীনে মোট ১৯টি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান ও মানবিক শাখার শিক্ষা কার্যক্রমও চলমান। কলেজের একাডেমিক ভবন–১, ২ ও ৩ ছাড়াও ভূগোল, উদ্ভিদবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রাণিবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত ভবনে নিয়মিত পাঠদান পরিচালিত হয়।

কলেজে উচ্চমাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার, যার বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৩০ জন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি ১২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক মাত্র একজন, যা একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। যেমন— সমাজতত্ত্ব বিভাগে ১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন মাত্র ২ জন, যার মধ্যে একজন ছুটিতে থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে, ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশাল বিদ্যাপীঠে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য মাত্র ৫টি হোস্টেল রয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে-এ-বাংলা, ড. আব্দুর সবুর ছাত্রাবাস এবং দুটি ছাত্রীনিবাস মিলিয়ে মাত্র ২৫০–৩০০ শিক্ষার্থীর থাকার সুযোগ আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

কলেজে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ১৩০ জন, যেখানে প্রতি ১২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য গড়ে একজন শিক্ষক বরাদ্দ। আবাসন ব্যবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়; পাঁচটি হোস্টেলে মাত্র ২৫০-৩০০ শিক্ষার্থীর থাকার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে

প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৪ জন। এছাড়া রেড বিল্ডিং, অডিটোরিয়াম বা লাইব্রেরির মতো স্থাপনাগুলো শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল। এমনকি কলেজের মেডিকেল সেন্টারটি একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে নামমাত্র সেবার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজের বেসরকারি কর্মচারীদের অবস্থাও নাজুক। একজন কর্মচারী জানান, দীর্ঘ ৭–৮ বছর ধরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি দিলেও মাসিক বেতন পান মাত্র ১২ হাজার টাকা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্তক্ষেপ চান অধ্যক্ষ

চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষক ও আবাসন সংকট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ৮৮তম অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘কলেজ থেকে প্রতি বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় ৭ কোটি টাকা দেওয়া হলেও, সেই অনুযায়ী তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে না।’

তার মতে, গবেষণা ও প্র্যাকটিক্যাল কাজের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে কলেজগুলোর একাডেমিক মান অনেক উন্নত করা সম্ভব। এছাড়া এসব সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হবে।

অধ্যক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “পর্যাপ্ত শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম এখন অনেকটাই ‘সনদনির্ভর’ হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষা দিয়ে সনদ নিয়ে যাচ্ছে, ফলে যোগ্য ও সৃজনশীল নাগরিক গড়ে তোলার মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।”

ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠকে টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবেই এই প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে— মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ