শফিকুল আলম সেলিম
বাংলার লোকসংগীত মানেই শুধু একতারা, দোতারা, ঢোল কিংবা বাঁশির সুর নয়। লোকসংগীত মানে মানুষের জীবনের গল্প, মাটির গন্ধ, নদীর ঢেউ, বিরহের দীর্ঘশ্বাস, প্রেমের আকুলতা আর আত্মার সঙ্গে আত্মার এক গভীর সংযোগ। এই সংগীতকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে প্রয়াস, সেখানে কয়েকজন শিল্পীর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। তাঁদের মধ্যে আনুশেহ আনাদিল একটি স্বতন্ত্র নাম।
তিনি কেবল একজন সংগীতশিল্পী নন; তিনি বাংলা লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক সাহসী পথিক। তাঁর কণ্ঠে কখনো বাউলের দর্শন, কখনো মাটির মানুষের প্রেম-বিরহ, আবার কখনো আধুনিক সংগীতের ব্যতিক্রমী আবহ একাকার হয়ে যায়। তাঁর গান শুনলে মনে হয়, পুরোনো কোনো গ্রামবাংলার পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আধুনিক নগরের কোনো এক জানালায় এসে দাঁড়িয়েছি। অথচ কোথাও শিকড় হারিয়ে যায়নি। আনুশেহর সংগীতের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই তিনি লোকসংগীতকে অতীতের স্মৃতিচিহ্ন করে রাখতে চাননি; বরং জীবন্ত সংস্কৃতি হিসেবে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
১৯৭৭ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় জন্ম আনুশেহ আনাদিলের। তাঁর বাবা জামাল আহমেদ সুফি এবং মা লুবনা মরিয়ম। মা ছিলেন নৃত্যশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী। ফলে ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। শৈশবে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সংগীতের প্রকৃত আত্মপরিচয় তৈরি হয় বাংলার বাউল, ফকির ও মরমি সাধকদের গান এবং দর্শনের সংস্পর্শে এসে।
শহরে বেড়ে ওঠা একজন তরুণীর কাছে গ্রামবাংলার বাউলদের জীবনদর্শন কীভাবে এত গভীর হয়ে উঠল, সেটি আনুশেহর জীবনের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তিনি বুঝতে শুরু করেন, সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; সংগীত মানুষের আত্মাকে চিনতে শেখায়। মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পাওয়ার একটি পথ তৈরি করে।
লালন ফকিরের গান, বাউলদের সহজিয়া দর্শন, দেহতত্ত্ব, মানবপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। এই দর্শনই পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলার লোকসংগীতের মধ্যে এমন এক জীবনবোধ রয়েছে, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করতে পারে।
১৯৯৮ সালে আনুশেহ যুক্ত হন ‘বাংলা’ ব্যান্ডের সঙ্গে। শায়ান চৌধুরী অর্ণব, বুনো, কার্তিক, শান্তনু ও অন্যান্য সংগীতশিল্পীর সঙ্গে তাঁর এই যাত্রা বাংলা সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়।
তখনকার শহুরে তরুণদের সংগীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল পাশ্চাত্য ধারার দিকে। রক, পপ, ব্লুজ কিংবা আধুনিক ব্যান্ডসংগীতের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল। সেই সময়ে ‘বাংলা’ ব্যান্ড এক ভিন্ন পথ দেখায়। তারা বাউল, লালন ও বাংলার প্রচলিত লোকগানের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন ঘটায়। দোতারা, একতারা, ঢোল ও বাঁশির পাশাপাশি গিটার, বেজ ও ড্রামের ব্যবহার লোকসংগীতে তৈরি করে নতুন মাত্রা।
২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’। অ্যালবামটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব’, যা লালন সাঁইয়ের দর্শন ও গানকে নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আনুশেহর কণ্ঠে লোকগান যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। তাঁর গায়কিতে ছিল না কৃত্রিম আড়ম্বর। ছিল এক ধরনের মাটির টান, আবেগ এবং আত্মিক গভীরতা। তাঁর গান শুনে অনেক শহুরে তরুণ প্রথমবারের মতো জানতে শুরু করেন লালন কে, বাউলরা কী ভাবেন, মানুষের ভেতরের মানুষ বলতে কী বোঝায়।
এভাবেই আনুশেহ শুধু গান গেয়ে জনপ্রিয় হননি; তিনি একটি প্রজন্মকে নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের দিকে ফিরে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
আনুশেহ আনাদিলের জনপ্রিয়তার পেছনে তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গানের প্রতি তাঁর গভীর আত্মনিবেদন। ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’, ‘ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা’, ‘আমার মনের মানুষ’, ‘এখন বোধ হয় ফুল ছড়ানোর পালা’ কিংবা ‘ধর্ম বুঝে মনরে সখা’ এ ধরনের গান তাঁর সংগীতজীবনের পরিচিত অধ্যায়।
বিশেষ করে ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’ গানটির পরিবেশনা দুই বাংলার শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানটির কথায় মানুষের অন্তর্জগৎ, আত্মপরিচয় ও আত্মঅনুসন্ধানের যে প্রশ্ন রয়েছে, আনুশেহর কণ্ঠে তা যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
তাঁর গানে প্রেম আছে, কিন্তু সেই প্রেম কেবল নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে মানুষকে ভালোবাসার আহ্বান আছে, প্রকৃতির প্রতি মমতা আছে, সমাজের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে। কখনো মনে হয়, তিনি গান গাইছেন নিজের জন্য; আবার কখনো মনে হয়, সেই গান আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের না-বলা কথাগুলোই প্রকাশ করছে।
২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একক অ্যালবাম ‘রাই’। এই অ্যালবামে নিজের লেখা ও সুর করা গানও স্থান পায়। এতে স্পষ্ট হয়, আনুশেহ শুধু অন্যের গানকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা শিল্পী নন; তিনি নিজেও একজন সৃজনশীল গীতিকার ও সুরকার।
আনুশেহর জীবনকে শুধু গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যাবে না। তিনি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্প-উদ্যোক্তা ও সমাজভাবনাসম্পন্ন মানুষ। ২০০০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘যাত্রা বাংলাদেশ’। দেশীয় শিল্প, কারুশিল্প, পোশাক, নকশা ও ঐতিহ্যকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়।
যাত্রার মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্য কেবল জাদুঘরে সংরক্ষণের বিষয় নয়। আমাদের তাঁত, মৃৎশিল্প, নকশা, লোকজ নকশা ও গ্রামীণ কারুশিল্পের মধ্যেও রয়েছে অসাধারণ সৃজনশীলতা। এই শিল্পকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
তাঁর কাছে সংস্কৃতির অর্থ শুধু মঞ্চে গান গাওয়া নয়; সংস্কৃতি মানে নিজের পরিচয়কে সম্মান করা, শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখা এবং মানুষের সৃজনশীলতাকে বিকশিত হতে দেওয়া।
আনুশেহর জীবন সব সময় আলোয় মোড়ানো ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনে নানা উত্থান-পতন, মানসিক টানাপোড়েন এবং কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে। জীবনের একটি পর্যায়ে মাদকাসক্তির সঙ্গেও লড়াই করেছেন তিনি। নিজের সেই অভিজ্ঞতা আড়াল না করে প্রকাশ্যে বলার সাহস দেখিয়েছেন। নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতি, সংগীত ও শেকড়ের কাছে ফিরে আসাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
এখানেই আনুশেহর জীবন আমাদের কাছে আরও মানবিক হয়ে ওঠে। জনপ্রিয়তার আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা একজন শিল্পীরও যে ভেতরে ভেতরে যুদ্ধ থাকে, যে মানুষটিও কখনো পথ হারান, আবার নিজের পথ খুঁজে নেন তাঁর জীবন সেই সত্যের কথাই বলে।
তিনি যেন প্রমাণ করেছেন, মানুষের জীবনে অন্ধকার আসতে পারে, কিন্তু অন্ধকারই শেষ কথা নয়। নিজের ভেতরের শক্তিকে খুঁজে পেলে আবারও নতুন করে শুরু করা যায়।
আনুশেহর সংগীতজীবনের সাম্প্রতিক অধ্যায়টি আরও বেশি আবেগের। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কানের টিনিটাসজনিত সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে শ্রবণক্ষমতা হারাচ্ছেন। কানের ভেতরে একটানা শব্দ হওয়ার কারণে উচ্চ শব্দ সহ্য করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এমনকি চিকিৎসকের পরামর্শে শ্রবণযন্ত্র ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও তাঁর জন্য স্বস্তিদায়ক হয়নি বলে জানান তিনি।
একজন শিল্পীর কাছে শ্রবণশক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়। যে মানুষটি সারা জীবন সুরের ভেতর নিজের পৃথিবী খুঁজেছেন, তাঁর জন্য শব্দের যন্ত্রণা কতটা কঠিন হতে পারে, তা কল্পনা করাও কষ্টের।
তিনি জানিয়েছেন, এ কারণেই এখন গ্রামের শান্ত পরিবেশে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্যে তিনি স্বস্তি খুঁজছেন।
খবরটি জানার পর তাঁর অসংখ্য শ্রোতার মনে নিশ্চয়ই একটি প্রশ্ন জাগে যে কণ্ঠ আমাদের এত আনন্দ দিয়েছে, সেই কণ্ঠ কি আবার আগের মতো মঞ্চ মাতাবে?তবে একজন শিল্পীর পরিচয় শুধু তাঁর মঞ্চে উপস্থিতি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও মানুষের মনে রেখে যাওয়া অনুভূতিও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।
আনুশেহ আনাদিলের সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, তিনি শুধু লোকগানকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রে পরিবেশন করেননি; লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, লালনের গান পুরোনো হতে পারে না, বাউলের দর্শন হারিয়ে যেতে পারে না, মাটির মানুষের জীবনবোধ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না।
একসময় যে তরুণেরা লালনের গানকে কেবল গ্রামীণ জীবনের অংশ বলে মনে করতেন, তাঁদের অনেকেই আনুশেহর কণ্ঠে সেই গান শুনে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। লোকসংগীত যে আধুনিক হতে পারে, বিশ্বসংগীতের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করতে পারে, আবার নিজের স্বকীয়তাও ধরে রাখতে পারে তিনি সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছেন।
আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো জনপ্রিয়তা নয়, বরং মানুষের মনে তৈরি করা সেই ভালোবাসা। তাঁর গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষকে ভালোবাসতে হলে মানুষের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে হয়। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়। আর নিজের পরিচয় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় নিজের শেকড়ের কাছে।
আনুশেহ আনাদিলের কণ্ঠে আমরা শুধু একজন শিল্পীকে শুনিনি; শুনেছি বাংলার মাটির কথা, নদীর কথা, বাউলের একতারার কথা, মানুষের মুক্তির কথা। তাঁর কণ্ঠের প্রতিটি বাঁকে যেন লুকিয়ে আছে বাংলার চিরচেনা এক বিষণ্ন অথচ সুন্দর পৃথিবী।
সময় বদলাবে, সংগীতের ধরন বদলাবে, নতুন শিল্পীরা আসবেন। কিন্তু যাঁরা নিজেদের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্মকে শেকড়ের সন্ধান দেন, তাঁদের অবদান সহজে মুছে যায় না।
আনুশেহ আনাদিল তেমনই একজন শিল্পী। তাঁর জন্য রইল গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। তাঁর জীবনের কঠিন সময়গুলো কেটে যাক, ফিরে আসুক সুস্থতা ও স্বস্তি। তাঁর কণ্ঠে আবারও ধ্বনিত হোক বাংলার মরমি সুর যে সুরে মানুষ নিজের হৃদয়কে খুঁজে পায়। কারণ, কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, মানুষের হৃদয়ে ঘর বাঁধে। আনুশেহ আনাদিল তেমনই এক কণ্ঠের নাম।