শফিকুল আলম সেলিম
কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন শুধু নিজের জীবনকে আলোকিত করতে নয়, একটি জাতির ইতিহাসে আলোর মশাল জ্বালাতে। তাঁদের জীবন, কর্ম, সাহস ও আত্মত্যাগ সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তেমনই এক মহৎ ব্যক্তিত্ব। বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যাঁর অবদান চিরস্মরণীয়, যাঁর সাহসী উচ্চারণ পাকিস্তানি শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
২ নভেম্বর ১৮৮৬ সালে তৎকালীন বাংলা প্রদেশের ত্রিপুরা জেলার রামরাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান মানুষটি। গ্রামবাংলার মাটি, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। তাঁর মাতা ছিলেন কুমিল্লার বাঙ্গরা উপজেলার চাপিতলা গ্রামের রক্ষিত পরিবারের কন্যা। পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষার পরিবেশ এবং মানবিক মূল্যবোধ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। ১৯০৪ সালে নবীনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯০৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। পরে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যয়ন করে ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ এবং ১৯১০ সালে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা তাঁকে শুধু পেশাগত যোগ্যতা দেয়নি, দিয়েছিল সমাজ ও রাষ্ট্রকে গভীরভাবে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর চিন্তার জগৎ সীমাবদ্ধ থাকেনি আদালতের চার দেয়ালে। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তাঁকে ক্রমাগত তাড়িত করেছে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রাজনৈতিক জীবন ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক দীর্ঘ অভিযাত্রা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি চেতনা এবং গণমানুষের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি অর্জনের পাশাপাশি সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ হিসেবেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি জনগণের মধ্যে নিহিত। তাই জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকারকে অস্বীকার করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
তবে ইতিহাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও নতুন রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন থেকেই প্রতিবাদ তৈরি হতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে সাহসী প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে আছে। তিনি দাবি জানান, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। তাই রাষ্ট্রের গণপরিষদে বাংলাকে বাদ দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।
তিনি শুধু আবেগের জায়গা থেকে কথা বলেননি; সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নিজের দাবি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, রাষ্ট্রের জনগণ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষার যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাষাগত পরিচয়কে অস্বীকার করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
তাঁর এই প্রস্তাব পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ মুসলিম লীগের নেতারা তাঁর দাবির বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সেই প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। বরং তাঁর বক্তব্য পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়। ভাষার প্রশ্নটি যে কেবল সাংস্কৃতিক বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক অধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণেই ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিকে বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। পাকিস্তান গণপরিষদ এবং পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে তিনি বারবার বাংলার মর্যাদা, বাঙালির অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্মের পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয়, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা ও সংস্কৃতিই একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর সেই দূরদর্শী বক্তব্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ বাঙালির ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে। এই অর্জনের পেছনে ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উত্থাপিত দাবির ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর সাহসী উদ্যোগ পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের পথ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা জুগিয়েছিল।
তবে তাঁর সংগ্রাম কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আজীবন গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, বাধা ও নিপীড়নের মুখেও তিনি আদর্শচ্যুত হননি। পাকিস্তানি শাসনামলে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে। বয়সের ভার তাঁকে দুর্বল করতে পারেনি, ভয় দেখিয়ে তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায়নি। তাঁর জীবন ছিল নীতির প্রশ্নে আপসহীন থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা থেকে রেহাই পাননি এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে এবং তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ময়নামতি সেনানিবাসে তাঁদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ৮৪ বছর বয়সেও মাতৃভূমি ও মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন এই মানুষটিকে শেষ পর্যন্ত জীবন দিতে হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন বিবরণ থাকলেও তিনি যে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছিলেন, তা ইতিহাসে স্বীকৃত।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন ও আত্মত্যাগ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায় আমরা কি সত্যিই তাঁর আদর্শকে ধারণ করতে পেরেছি? যে মানুষটি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছিলেন, তাঁর অবদান কি আমরা যথাযথভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পেরেছি? ভাষার জন্য সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি অধ্যায়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দাবি রাখে। তিনি শুধু একজন ভাষাসৈনিক নন, তিনি বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম অগ্রপথিক। তাঁর ১৯৪৮ সালের সাহসী উচ্চারণ পরবর্তী সময়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
২ নভেম্বর এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্মদিনে দৈনিক প্রকৃতির সংবাদ-এর পক্ষ থেকে ভাষাসংগ্রামী, দেশপ্রেমিক ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
হে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আপনি আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু আপনার সেই সাহসী উচ্চারণ আজও বাংলার আকাশে প্রতিধ্বনিত হয়। আপনার জীবন আমাদের শেখায়, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা যায় না, মাতৃভাষার মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া যায় না, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। আপনার জন্ম হয়েছিল রামরাইলের মাটিতে, কিন্তু আপনার কর্ম ও আত্মত্যাগ আপনাকে স্থান দিয়েছে সমগ্র বাঙালি জাতির হৃদয়ে। ইতিহাসের পাতায় আপনার নাম কখনো মুছে যাবে না। আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলার ভাষায়, বাঙালির আত্মপরিচয়ে এবং স্বাধীনতার চেতনায়।