দ্রব্যমূল্য

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে স্বস্তি বিএনপিতে, বাজারে সাধারণ মানুষ অস্বস্তিতে

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর দাবি, বাজেটের পর ৬০ নিত্যপণ্যে কর কমেছে; বাজারের চিত্র ভিন্ন 

জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কমেনি মানুষের ব্যয়ের চাপ

চিনি, তেল, ডিম ও সবজির দামে ওঠানামা; সাধারণ ক্রেতার স্বস্তি ফেরেনি

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা উদ্যোগ এবং মূল্যস্ফীতি কমার ধারাবাহিকতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি; বরং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে।

তবে সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক বাজারদরের দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের স্বস্তির চিত্রটি এতটা স্পষ্ট নয়। জুলাইয়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা হলো, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমে যাওয়া। ফলে কয়েক বছর ধরে পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে আগের উচ্চ দামই থেকে যায়। এ কারণেই সরকারের পরিসংখ্যানের স্বস্তি আর ভোক্তার বাজারের অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ হলেও এর অর্থ এই নয় যে এক বছর আগের তুলনায় বাজারে পণ্য সস্তা হয়েছে। বরং মূল্যস্ফীতির হার ইতিবাচক থাকা মানে সামগ্রিক মূল্যস্তর আগের বছরের তুলনায় এখনও বেশি।

এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সংসারের মোট ব্যয় কমে না।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ—এ তথ্যের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশের তুলনা করলে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে হার সামান্য বেড়েছে।

অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও কয়েক মাসের প্রবণতা দেখা প্রয়োজন।

গত জুনে বাজেট ঘোষণার পর কক্সবাজারে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাজেট দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। বরং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকার এসব পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকারের এই অবস্থানের সঙ্গে আরও কিছু পদক্ষেপও রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ বাড়ানো, আমদানি সহজ করা এবং ভোক্তাদের কম দামে পণ্য দেওয়ার জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ—টিসিবির কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

সম্প্রতি টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও নির্বাচিত নিত্যপণ্য খোলাবাজারে বিক্রির পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। শুরুতে তেল দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছে; বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ডাল ও চিনিও যুক্ত হতে পারে।

রাজধানীর সাম্প্রতিক খুচরা বাজারে দেখা যাচ্ছে, সব পণ্যের দাম একসঙ্গে না বাড়লেও বেশ কিছু পণ্যের দাম এখনও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।

সাম্প্রতিক বাজারদরের হিসাবে মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। মসুর ডালের বড় দানা কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারেও চাপ রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজধানীর খুচরা বাজারে চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচেছ । দেশীয় উৎপাদিত লাল চিনি ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচেছ। একই সময়ে  কয়েকটি সবজির দাম কমলেও বেশকিছু সবজি ১০০ থেকে ১৬০ টাকা কেজির মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

 আগস্টের শুরুতে ঢাকার বাজারে ডিমের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা (প্রতিডজন) পর্যন্ত ওঠা নামা করতে দেখা যায়।

অর্থাৎ বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমছে, আবার কিছু পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ভোক্তার মাসিক বাজার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—এমন চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সংস্থাটি ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রির পাশাপাশি নতুন ব্যবসায়িক মডেলেও যেতে চাইছে। ভর্তুকির চাপ কমাতে সাবান, চা, লবণ, আটা ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে টিসিবি।

টিসিবির হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায় উঠলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ২ হাজার ৭১৭ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকায় নেমেছে।

তবে বাজারে টিসিবির হস্তক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পণ্য সংগ্রহ, সরবরাহের পরিমাণ, বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ওপর।

দ্রব্যমূল্যের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের আয় ও পণ্যের দামের সম্পর্ক। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকলে এবং একই সময়ে মানুষের আয় যদি তার চেয়ে কম হারে বাড়ে, তাহলে বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

অর্থাৎ একজন মানুষের আয় ১০ শতাংশ বাড়লেও যদি তার প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার খরচ তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তাহলে আয় বাড়ার সুফল সে পাবে না।

এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির বিষয়টিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখা, আমদানি ব্যয় কমানো, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকানো এবং কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার মধ্যবর্তী স্তরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করা—এসব ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে ৬০টি নিত্যপণ্যে কর কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপকে ইতিবাচক ফল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে চিনি, তেল, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে ওঠানামা এবং উচ্চ মূল্যস্তর সাধারণ মানুষের অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে।

এখানেই সরকারের রাজনৈতিক স্বস্তি ও ভোক্তার বাস্তব অভিজ্ঞতার পার্থক্যটি স্পষ্ট হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির হার কমা অর্থনীতির জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হলো—মাস শেষে বাজার করতে কত টাকা লাগে। সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে না কমলে কাগজে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে স্বস্তি ফেরানো কঠিন।

তাই বিএনপি সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমানো নয়; বরং নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, মানুষের আয় বাড়ানো এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ