গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত দুই বছরে দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা। এসব কারখানা বন্ধের পেছনে কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ, আর্থিক সংকট, শ্রমিক অসন্তোষের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। শুধু হবিগঞ্জেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানার উৎপাদন কয়েক দিন থমকে যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, আবার কোথাও শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে বসে সময় কাটিয়েছেন। এতে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯৮টি কারখানা গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮৭টি তৈরি পোশাক খাতের বাইরে এবং বাকিগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, নিট পোশাক, টেক্সটাইল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের কারখানা রয়েছে।
তবে এই ৪৫৭টি কারখানা শুধু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বন্ধ হয়েছে—এমনটি বলা যাবে না। শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানা বন্ধের প্রধান কারণের মধ্যে রয়েছে বিদেশি ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, মালিকদের আর্থিক সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ এবং জ্বালানি সংকট। একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৫৭টি কারখানার প্রায় ৮৬ শতাংশ বন্ধের সঙ্গে কমে যাওয়া কাজের আদেশ ও মালিকদের আর্থিক সংকট জড়িত।
গ্যাস সংকটের সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে। প্রায় ২০ দিন ধরে সেখানে গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম ছিল। পরে ১২ আগস্ট থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে।
শিল্পকারখানাগুলোর অনেকগুলোই নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদন চালায়। ফলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু কারখানার চুল্লি বা উৎপাদনযন্ত্র নয়, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়। এতে পুরো শিল্পাঞ্চল কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, হবিগঞ্জের এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় এসব শ্রমিকের বড় অংশ কর্মহীন অবস্থায় পড়েন।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিমুখী শিল্প। হবিগঞ্জের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সায়হাম গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা রয়েছেন। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাদের উৎপাদন পুরোপুরি থেমে যায়। একইভাবে হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীও উৎপাদন বন্ধের কারণে কর্মহীন অবস্থায় পড়েন বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
স্কয়ার ডেনিমের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জের বাইরে দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব তীব্র। শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকটের কারণে দেশে ৯০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু টেক্সটাইল নয়, তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে।
নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে আসছেন। কোথাও উৎপাদন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, আবার কোথাও কারখানা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশে মোট কতজন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, তার কোনো একক ও নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তাই ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ মানেই ৪৫৭টি প্রতিষ্ঠানের সব শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন—এমন হিসাব করাও ঠিক হবে না।
কারণ অনেক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক উৎপাদন করছে। আবার গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হলে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে অথবা কাজ না থাকলেও কর্মস্থলে রাখা হচ্ছে।
তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাময়িক কর্মহীনতা থেকে স্থায়ী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের সময়ই শ্রমিকদের মধ্যে ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।
হবিগঞ্জে তিন দিন বন্ধ থাকার পর ১৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হয়। জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। গ্যাস ফিরে আসায় কারখানাগুলোও উৎপাদন পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি নেয়।
তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। কারণ সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন পরিকল্পনা, রপ্তানি ক্রয়াদেশ এবং কর্মসংস্থান—তিনটিই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর শ্রমিক ছাঁটাই ঠেকানোর চেয়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন নয়, রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।