আজ ২২ আগস্ট (শনিবার) ধর্মীয় কারণে সহিংসতার শিকারদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস বা মতাদর্শের কারণে সহিংসতার শিকার মানুষ ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি জানানো এবং বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়াই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৯ সালে গৃহীত প্রস্তাবের মাধ্যমে দিবসটি ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
বিশ্বের ৮০০ কোটির বেশি মানুষের এ পৃথিবীতে ধর্ম, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ বৈচিত্র্যের মধ্যেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ এখনো কেবল ধর্ম বা বিশ্বাসের কারণে বৈষম্য, নিপীড়ন, হামলা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার এ বাস্তবতা মানবাধিকারের মৌলিক চেতনাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভয়াবহ সহিংসতা সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় ১৮ মাসে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রায় ৩,১০০ সহিংসতার ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন।দিবসটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ধর্ম বা বিশ্বাসের কারণে সহিংসতার শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা বাড়ানো।
জাতিসংঘের অবস্থান হলো—কোনো ধর্ম, বিশ্বাস বা মতাদর্শ মানুষের জীবন, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের ওপর হামলা বা সহিংসতার বৈধতা হতে পারে না। ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, তেমনি প্রত্যেক মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একজন মানুষ নিজের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বা বিশ্বাস গ্রহণ, পরিবর্তন কিংবা পালন করতে পারেন—এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পাশাপাশি উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এসব হামলা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না; বরং সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিকেও দুর্বল করে।ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ মোকাবিলায় জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক কাঠামো, রেজল্যুশন ১৬/১৮ এবং রাবাত কর্মপরিকল্পনা ধর্মীয় বিদ্বেষ, বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এসব উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘৃণামূলক বক্তব্য, গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে।
ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে মিথ্যা তথ্য বা উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে তা কখনো কখনো বাস্তব জীবনে উত্তেজনা ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তাই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডিজিটাল পরিসরকে ঘৃণা ও বিভাজনের মাধ্যম না বানিয়ে শান্তি, সহনশীলতা, তথ্যভিত্তিক মতবিনিময় ও সামাজিক সম্প্রীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।বাংলাদেশের সংবিধানও ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতি স্বীকার করেছে। সংবিধানের ১২, ২৭, ২৮ ও ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিকদের সমঅধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের প্রচলিত আইনে উপাসনালয়ে হামলা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা, সহিংসতা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণও অত্যন্ত জরুরি।বিশ্বে হাজার হাজার ধর্ম ও আঞ্চলিক বিশ্বাসের চর্চা রয়েছে। প্রধান ধর্মগুলোর পাশাপাশি শিখ, ইহুদি, বাহাই, তাওবাদ, কনফুসীয় মতবাদ, জৈন, শিন্তো, জরথুস্ত্রবাদসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের অনুসারীরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে বসবাস করেন।
এ বৈচিত্র্য মানবসভ্যতার একটি মূল্যবান সম্পদ। তাই কোনো ব্যক্তি বা উগ্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো কখনোই যুক্তিসংগত নয়। সহিংসতার ক্ষেত্রে ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা, শিক্ষাবিদ, মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে শান্তি, সহমর্মিতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা দিয়ে আসছেন। ধর্মীয় নেতাদের ইতিবাচক বক্তব্য ও আন্তধর্মীয় সংলাপ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো শিক্ষা। শিশু ও তরুণদের ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন।
একটি সমাজে মানুষ নিজের বিশ্বাস স্বাধীনভাবে পালন করার পাশাপাশি অন্যের বিশ্বাস ও অধিকারকেও সম্মান করবে—এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।২২ আগস্টের আন্তর্জাতিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবাধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের একক অধিকার নয়। এগুলো প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার।
ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে সংঘাতের কারণ না বানিয়ে মানবিক সহাবস্থানের শক্তিতে পরিণত করতে হবে। ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা, বিভেদের পরিবর্তে সংলাপ এবং সহিংসতার পরিবর্তে শান্তির পথ বেছে নেয়াই হতে পারে একটি নিরাপদ ও মানবিক বিশ্বের ভিত্তি।
ধর্ম যার যার, বিশ্বাস যার যার—কিন্তু মানবিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা সবার। এ সার্বজনীন সত্যকে সামনে রেখেই ধর্ম বা বিশ্বাসের কারণে সহিংসতার শিকার প্রত্যেক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নতুন করে গ্রহণ করতে হবে। ধর্ম, ভাষা, জাতি, সংস্কৃতি কিংবা মতাদর্শের পার্থক্যকে ঘৃণার কারণ না বানিয়ে বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থানের শিক্ষা দিতে হবে।