সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহার করতেন বিদেশি সিম ও মুঠোফোনের বিশেষ অ্যাপ। পাওয়া গেছে ভারতীয় আধার কার্ডও। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
গতকাল বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা নেটওয়ার্কের বাইরে অবস্থান করেন। সিম ব্যবহার করেন না। বিদেশি নম্বর, অ্যাপসের মাধ্যমে কথা বলেন। ডেভিড ইমনও সেটা করতেন। তিনি যখন দেখলেন তাঁর ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে, তখন তিনি বিদেশে থাকা গ্যাং লিডার সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাজ্জাদের পরামর্শে ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে আমরা জানতে পারি। ইমন ভারতের আধার কার্ডও করিয়েছেন। সেখানে তাঁর নাম আজহার খান।’
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে ইমন খুলনার দিকে যাবেন। আমরা পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট স্থাপন করি। মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের ব্যাড লাক, আমরা ওই সময়ও তাঁকে ধরতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে তিনি খুলনায় যাবেন। খুলনা জেলা পুলিশের সহায়তায় রূপসার দিকেও আমরা একটা চেকপোস্টের ব্যবস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু তাঁরা বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। হঠাৎ গোপালগঞ্জ থেকে নড়াইলের দিকে চলে যান। তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মতো বাজে। পরে নড়াইল থেকেও চলে যান তাঁরা। শেষে ভোর পাঁচটার দিকে যশোর পুলিশের সহায়তায় ঝুমঝুমপুর এলাকায় আমরা ডেভিড ইমন ও তাঁর আরও তিনজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই।’
ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি প্রচার হয়ে যাওয়ায় অপারেশনের পরবর্তী কার্যক্রমগুলো কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি বলেও জানান তিনি।
মাসুদ জানান, যখন ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার অভিযান চলছিল, ঠিক একই সময়ে চট্টগ্রামের আরেক কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরেকটি টিম নোয়াখালীতে অবস্থান করছিল। টিভি স্ক্রলে যখন আসে “শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার”, তখন আমাদের ওই টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে তিনি পালিয়ে যান।’
এসপি মাসুদ আলম আরও জানান, ‘ডেভিড ইমনের ঝিকরগাছা হয়ে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। কে সীমান্ত পার করবেন এবং ভারতে কে রিসিভ করবেন, সব ঠিক করা ছিল। এমনকি তাঁর কাছে আধার কার্ড পাওয়া গেছে, যেটা ভারতে ব্যবহার করার কথা ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ইমনের বিরুদ্ধে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। তাঁকে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আরও তথ্য জানানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার শেখ মো. সেলিম, সিরাজুল ইসলাম, জুনায়েদ কাওসার, মো. রাসেল ও কাজী মো. তারেক আজিজ প্রমুখ।
কে এই ইমন
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় আলোচিত হন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫টি।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেন। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন।