বেসরকারি বিনিয়োগের বিতর্কিত পরিকল্পনা

ব্যাপক বিরোধিতার মুখে যেভাবে পিছু হটলেন ফিফা সভাপতি

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

ব্যাপক বিরোধিতার মুখে বিশ্বকাপসহ ফিফার টুর্নামেন্টগুলোর স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল করেছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

পরিকল্পনাটির সমর্থন আদায়ে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেককে ৪ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এই পরিকল্পনার আওতায় পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল।

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার ৫৫টি সদস্য সংস্থা গত বৃহস্পতিবার ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে তারা বিশ্বকাপ বয়কট করবে। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুর বলেছেন, ‘এই প্রকল্পটি সম্পর্কে ফিফার নিজস্ব প্রশাসনকে প্রতারণার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।’

এর আগে আরও দুটি বড় আঞ্চলিক ফুটবল কনফেডারেশনও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং চলতি গ্রীষ্মের বিশ্বকাপের আয়োজক কনকাকাফ জানিয়েছে যে, এর সদস্যরা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্রমতে, এই অঞ্চলের অধিকাংশ সংগঠনই ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারাচ্ছে বা হারিয়ে ফেলেছে।

এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা এএফসি জানিয়েছে, তারা উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, ‘ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ইনফান্তিনো সঠিক ব্যক্তি নন’।

ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল

উয়েফা ও কনকাকাফ পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করলেও, শুক্রবার প্রথমদিকে ফিফা জানিয়েছিল যে তারা প্রস্তাবটি নিয়ে এগিয়ে যাবে। সংস্থাটি বলেছিল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’। তবে পরিকল্পা বাতিলের ঘোষণা দিতে গিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো স্বীকার করেন, প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য ফিফার সদস্য দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ, ২১১ সদস্যের মধ্যে অন্তত ১০৬টি দেশের ভোট দরকার ছিল।

এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা এএফসি যখন উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে, তখন সেই সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যায়। উয়েফার ভোটসংখ্যা ৫৫, কনকাকাফের ৩৫ এবং এএফসির ৪৬। যদি তিনটি কনফেডারেশনের সব সদস্য দেশ নিজ নিজ আঞ্চলিক সংস্থার অবস্থান অনুসরণ করত, তাহলে মোট ১৩৬টি দেশ ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিপক্ষে ভোট দিত।

আফ্রিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ এবং ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশন-ওএফসি জানিয়েছিল, তারা আগস্টে ফিফার প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল জানায়, প্রস্তাবটির পরিধি, কাঠামো, পরিচালনা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে তারা ফিফার কাছে অনুরোধ করেছে।

ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা কী ছিল?

ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ সংস্থার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। ওই প্রতিষ্ঠানে বাইরের বিনিয়োগকারীরা অংশীদারিত্ব কিনতে পারতেন।

ফিফা জানিয়েছিল, তারা নতুন প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে নতুন এই প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় পক্ষের বিনিয়োগকারীদের সংখ্যালঘু ও নিয়ন্ত্রণহীন অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। ওই সময়ের মধ্যে পরিকল্পনায় সম্মতি দিলে তারা প্রাথমিকভাবে ২ কোটি মার্কিন ডলার বা এক কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ সহায়তা পেতে পারতো।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান প্রস্তুত করা ২৫ পৃষ্ঠার একটি নথিতে দেখানো হয়েছিল যে, ফিফার টুর্নামেন্টগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩৫-২০৩৯ সময়কালে প্রতিটি সদস্য ফেডারেশনকে আনুমানিক দুই কোটি ৪০ লাখ ইউরো বা দুই কোটি পাঁচ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হবে।

নথিটিতে নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ এবং প্রণোদনা-ভিত্তিক পারিশ্রমিকের মাধ্যমে শীর্ষ প্রতিভা আকর্ষণ করার কথাও উল্লেখ ছিল। এতে বিশ্বকাপকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া আসর হিসেবে বর্ণনা করা হলেও বলা হয়, ফিফা এখনো তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তবে সমালোচকদের নজরে আসে যে, পুরো নথিতে নারী ফুটবল বা নারী বিশ্বকাপ সম্পর্কে কোনো উল্লেখই ছিল না।

ফিফা জানিয়েছিল, থ্রাইভ ইটারনাল নামে একটি বিনিয়োগ গোষ্ঠী এফএফই-এর সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্ব দেবে। থ্রাইভ হলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা জোশুয়া কুশনার। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। শুক্রবার প্রথমবারের মতো এ প্রস্তাব নিয়ে মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। তবে ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার সঙ্গে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

ইনফান্তিনো কি টিকে থাকতে পারবেন?

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি এএফসি সভাপতি শেখ সালমান আল-খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। ফিফার পরবর্তী সভাপতি নির্বাচিত হবেন আগামী বছরের মার্চে মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য সংস্থাটির ৭৭তম কংগ্রেসে। প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৮ই নভেম্বর।

চলতি সপ্তাহের ঘটনাগুলোর আগে ধারণা করা হচ্ছিল, ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও নির্বাচিত হবেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য ফেডারেশন ইতোমধ্যে তাকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছিল। তবে এ সপ্তাহের বিতর্কের পর তারা সেই সমর্থন প্রত্যাহার করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণায় ইনফান্তিনো বলেন, ‘তার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল সদস্য ফেডারেশনগুলোকে আরও শক্তিশালী করা, বিশেষ করে যেসব দেশে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ছিল এবং থাকবে সবাইকে একত্রিত করা এবং উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া।’ কিন্তু বাস্তবে এই প্রস্তাব ফিফার ভেতরেই বড় ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে হোয়াইট হাউসের টাস্কফোর্সে ফিফার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা কার্লোস কর্দেইরো এই পরিকল্পনার কারণে পদত্যাগ করা প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে কর্ডেইরো বলেছেন, তিনি এই পরিকল্পনার দ্ব্যর্থহীনভাবে বিরোধিতা করেছেন এবং ফিফার বৃহত্তর মূল্য উন্মোচনের জন্য বাইরের বিনিয়োগকারী প্রয়োজন এই প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি আরও যোগ করেন যে, এই প্রস্তাবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

জানা গেছে, প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে সাত বিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহ করতে পারত বলে দাবি করা এই পরিকল্পা সম্পর্কে ফিফার আটজন সহ-সভাপতির (ভাইস প্রেসিডেন্ট) কয়েকজনকেও আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুর এই উদ্যোগকে ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, একজন সভাপতির কাজ হলো মানুষকে একত্র করা, তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা এবং অনুপ্রাণিত করা। কিন্তু এই পরিকল্পা ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণে যদি আমার চাকরি চলে যায়, তবুও আমি তা মেনে নেব এবং সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করব। অন্তত আজ রাতে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ