বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরে ক্ষতি ৪৫০ বিলিয়ন ডলার

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল ও

ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে একটি

স্বাভাবিক বছরে বিশ্বে প্রায় ৪৫০

বিলিয়ন বা ৪৫ হাজার কোটি

ডলারের ক্ষতি হতে পারে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের ক্ষতি বাড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন বড় কারণ। একই সঙ্গে শহর ও জনবসতি দ্রুত বাড়ায় আরো বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে একটি স্বাভাবিক বছরে বিশ্বে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন বা ৪৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এর বড় একটি অংশের কোনো বীমা সুরক্ষা নেই। খবর এফটি।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্কের সাম্প্রতিক প্রাক্বলনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বে মোট ক্ষতির ৬২ শতাংশ পর্যন্ত বীমার আওতার বাইরে থাকে। অর্থাৎ একটি স্বাভাবিক বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি সরাসরি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের ওপর পড়ে। বড় কোনো দুর্যোগ হলে ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেক বেড়ে যেতে পারে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের ক্ষতি বাড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন বড় কারণ। একই সঙ্গে শহর ও জনবসতি দ্রুত বাড়ায় আরো বেশি বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এর সঙ্গে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে আবাসিক ভবন নির্মাণের ব্যয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেড়েছে দ্রুত। ফলে একই মাত্রার দুর্যোগেও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে এখন বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
বীমা কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে এ পরিস্থিতিতে। দুর্যোগের কারণে ক্ষতিপূরণ দেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু মোট ক্ষতির তুলনায় বীমার আওতায় আসা ক্ষতির অংশ কমছে। অর্থাৎ দুর্যোগের ক্ষতি বাড়লেও তার পুরোটা বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাল দেয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিকভাবে বীমা করা সম্পদের দুর্যোগজনিত ক্ষতি টানা ষষ্ঠ বছরের মতো ১০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে কোনো ঘূর্ণিঝড় আঘাত না হানলেও বীমা কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার ভয়াবহ দাবানল ও শক্তিশালী বজ্রঝড়ের ক্ষতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষতি বাড়ার সঙ্গে বীমা কোম্পানিগুলোও নিজেদের নীতি পরিবর্তন করছে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদ মেরামতের মতো খাতে ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ফলে কিছু বীমা কোম্পানি সাধারণ নীতিমালার শর্ত কঠোর করেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঝুঁকি বীমার আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে।
কিছু বড় বীমা কোম্পানি আবার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। এসব এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ির বীমা পলিসি নবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে বাড়ির মালিকদের জন্য বীমা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
উদীয়মান অনেক বাজারে পরিস্থিতি আরো কঠিন। এসব দেশের যেসব এলাকা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেখানকার বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশের কোনো বীমা নেই। ফলে দুর্যোগের পর ক্ষতির পুরো বোঝা পড়ে ব্যক্তি, ব্যবসা ও সরকারের ওপর।
উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারের কথা উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালের মার্চে দেশটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। কিন্তু এর বিপরীতে বীমা কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ১০ কোটি ডলারেরও কম। দেশটিতে বীমার ব্যবহার কম থাকায় ক্ষতির প্রায় পুরো অংশই বীমার বাইরে থেকে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসেও বন্যার ক্ষেত্রে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভয়াবহ বন্যায় ১৩০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। এতে আবাসিক খাতে প্রায় ১১০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ক্ষতির বড় অংশই বীমার আওতায় ছিল না।
এর একটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ বাড়ির বীমা নীতিমালায় বন্যার ক্ষতি সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে না। ফলে বন্যায় বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক মালিক বীমা থেকে ক্ষতিপূরণ পান না।
সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে ‘বীমা সুরক্ষা ঘাটতি’ও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়লে এ ব্যবধান আরো বড় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ