আমদানি নিয়ন্ত্রণে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তি
রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়
ক্রেতার চাহিদামতো বিশেষ ধরনের কাঁচামাল নিয়ে শঙ্কা
ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দাবি পোশাকশিল্পের
দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কাঁচামাল আমদানিতে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী কারখানার প্রয়োজনীয় সুতা ও বিশেষ ধরনের ফেব্রিক্স আমদানিতে বিধিনিষেধ বাড়লে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে টেক্সটাইল মিলমালিক ও পোশাক রপ্তানিকারকদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানার মালিকেরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের পর্যাপ্ত বাজার নিশ্চিত করতে কিছু আমদানি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। অন্যদিকে রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সব ধরনের সুতা ও ফেব্রিক্স স্থানীয় বাজারে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদামতো মান, বৈচিত্র্য ও দামে পাওয়া যায় না। ফলে আমদানির পথ সংকুচিত হলে শেষ পর্যন্ত রপ্তানি খাতই চাপে পড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর আগে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল। এ নিয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে সরবরাহ সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান পশ্চাৎমুখী শিল্পগুলোর একটি। স্থানীয় মিলমালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কম দামের আমদানিকৃত সুতা ও কাঁচামালের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দেশের স্পিনিং মিলগুলো চাপে পড়ছে। বিশেষ করে কম দামের পণ্য আমদানির কারণে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনও সরকারের কাছে কিছু ধরনের সুতা আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমদানির সুযোগ অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্প্রতি সংগঠনটি আমদানি নীতি পর্যালোচনারও দাবি জানিয়েছে।
তবে পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের পথ পুরোপুরি সংকুচিত করা সমাধান হতে পারে না।
পোশাক রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু সাধারণ মানের ফেব্রিক্স দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও ক্রেতার আলাদা চাহিদা থাকে। কোথাও বিশেষ ধরনের ফাইবার, কোথাও নির্দিষ্ট মানের সুতা, আবার কোথাও পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রত্যয়ন করা কাঁচামালের প্রয়োজন হয়।
বিজিএমইএর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রপ্তানি উৎপাদনের জন্য সুতা আমদানি কেবল স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতার কারণে নয়; পণ্যের বৈচিত্র্য, বিশেষ ধরনের সুতা, ক্রেতার নির্দিষ্ট চাহিদা, প্রত্যয়নযোগ্য কাঁচামাল এবং দ্রুত সরবরাহের প্রয়োজনের সঙ্গেও এটি যুক্ত। সংগঠনটির হিসাবে, দেশের নিট পোশাক রপ্তানির বড় অংশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফেব্রিক্স ব্যবহৃত হলেও একটি অংশের কাঁচামাল কাঠামোগত কারণেই আমদানিনির্ভর।
এ কারণে বিশেষ ধরনের ফেব্রিক্স আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হলে কিছু কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানিকারকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ উৎপাদন ব্যয়। তাঁরা বলছেন, কাঁচামালের পর্যাপ্ত বিকল্প উৎস না থাকলে কয়েকটি স্থানীয় সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে। এতে দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে আমদানি সুবিধা সীমিত করার উদ্যোগের বিরোধিতা করে। সংগঠন দুটির নেতারা তখন বলেন, স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মান ও প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তাঁরা দেশীয় উৎস থেকেই সংগ্রহ করতে আগ্রহী। তবে জোর করে আমদানি সীমিত করলে তৈরি পোশাকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পোশাক খাত এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। ক্রেতারা একদিকে কম দাম চান, অন্যদিকে দ্রুত সরবরাহ, উন্নত মান এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত দিচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের মতে, এ অবস্থায় কাঁচামালের দাম বাড়লে সেই বাড়তি ব্যয় সব সময় ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা সম্ভব হয় না।
গত ২৪ আগস্ট সরকার নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২৯ জারি করেছে। নতুন নীতিতে বিভিন্ন খাতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কিছু সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। তবে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের সংগঠনগুলো নীতির বিভিন্ন বিধান নিজেদের শিল্পের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা পর্যালোচনা করছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফেব্রিক্স বা সুতার ক্ষেত্রে একক কোনো নীতি দিয়ে পুরো শিল্পের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। দেশে যেসব পণ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে, আন্তর্জাতিক মানে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তবে যেসব বিশেষ ধরনের কাঁচামাল দেশে পাওয়া যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের আমদানির সুযোগ রাখা প্রয়োজন।
রপ্তানিকারকদের দাবি, কাঁচামাল সরবরাহে বাধা তৈরি হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করতে না পারা। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎপাদক দেশে চলে যেতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানেও।
বিজিএমইএ এর আগে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে দেওয়া মতামতে বলেছিল, সুতা আমদানিতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা কঠোর শুল্ক আরোপ সরবরাহসংকট তৈরি করতে পারে। এতে ক্রেতা হারানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলমালিকেরা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন টিকিয়ে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
ফলে এখন প্রশ্ন হলো, দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নিশ্চিত করার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য আনা হবে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞা বা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত আমদানি—দুই চরম অবস্থানের পরিবর্তে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারদর, ক্রেতার চাহিদা ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করাই হতে পারে এই সংকটের কার্যকর সমাধান।