রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের পর দিন চুলায় গ্যাসের দেখা নেই। কোথাও গভীর রাতে কিছু সময়ের জন্য গ্যাস এলেও দিনের বেশির ভাগ সময় রান্না বন্ধ থাকছে। একই সময়ে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কম গ্যাসচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, খাদ্য ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন কমে এসেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি এখন বড় ধরনের চাপের মুখে। সরকার বলছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে আসে। ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আবাসিক খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে।
দুই এলএনজি কার্গো অপেক্ষায় : সংকট আরও জটিল হয়েছে কারণ বিদেশ থেকে আসা দুটি এলএনজি কার্গো সমুদ্রে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল সচল না হওয়ায় সেগুলো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় গ্যাস দেশে পৌঁছালেও তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মেরামতকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন লাগতে পারে। তিনি পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জনগণকে সাময়িক ভোগান্তি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংকট পুরোপুরি কাটতে কিছুটা সময় লাগলেও আগামী সপ্তাহ থেকেই পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল আংশিক চালু হলে প্রথমে দৈনিক প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। এরপর ধাপে ধাপে সরবরাহ বাড়িয়ে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, মেরামতকাজ শেষ হলে এবং অপেক্ষমাণ এলএনজি কার্গোগুলো খালাস করা সম্ভব হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে শিল্প : সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্পখাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, স্পিনিং, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রাসায়নিক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ পিএসআই গ্যাসচাপের পরিবর্তে মিলছে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই। এতে অনেক যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে, আবার কোথাও কিছু সময়ের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় এ অবস্থা চললে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ : শিল্পের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দিনের বড় অংশজুড়ে চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার গভীর রাত বা ভোরে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছে। কোথাও কোথাও একেবারেই গ্যাস না থাকায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে।
গৃহিণীরা বলছেন, প্রতিদিন কখন গ্যাস আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ সারি : গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অনেক স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থা দীর্ঘ হলে গণপরিবহন পরিচালনায়ও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
খাদ্য ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি : অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাস সংকট শুধু শিল্প উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও এর প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামেও পড়তে পারে। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্যাস সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দ্রুত সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত মেরামত, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল দ্রুত সচল করা। এটি আংশিক চালু হলেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং শিল্প ও আবাসিক খাতে চাপ কিছুটা কমবে। এরপর অপেক্ষমাণ এলএনজি কার্গো খালাস করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে।
তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে। তাই আগামী কয়েক দিন শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি অব্যাহত থাকতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক এই সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বিকল্প অবকাঠামো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় একটি স্থাপনায় যেকোনো দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটিই আবারও সারা দেশের জ্বালানি সরবরাহকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।