শফিকুল আলম সেলিম
কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যান, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে কখনো হারিয়ে যান না। তাঁদের কণ্ঠস্বর, ব্যক্তিত্ব, চিন্তা আর কাজ সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ফজলে লোহানী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও টেলিভিশন উপস্থাপনায় তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে যায় সাদামাটা অথচ গভীর জীবনবোধে ভরা এক ব্যক্তিত্বের কথা, যিনি কথার জাদুতে দর্শককে হাসাতেন, ভাবাতেন এবং সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শেখাতেন।
১৯২৮ সালের ১২ মার্চ সিরাজগঞ্জের কাউলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফজলে লোহানী। তাঁর বাবা আবু লোহানী ছিলেন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। মা ফাতেমা লোহানী ছিলেন কলকাতা করপোরেশন স্কুলের শিক্ষিকা। পরিবার থেকেই তিনি পেয়েছিলেন জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহ। বড় ভাই ফতেহ লোহানীও ছিলেন খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার ফলে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বোধের এক অনন্য সমন্বয়।
সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেননি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সেই অসমাপ্ত অধ্যায় তাঁর জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃত জগৎ হয়ে ওঠে তাঁর কর্মক্ষেত্র।
মাত্র তরুণ বয়সেই সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার জগতে তাঁর পদচারণ শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক পূর্ব বাংলা। পরে ১৯৪৯ সালে প্রকাশ করেন অগত্যা নামের মাসিক সাময়িকী। সে সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পত্রিকা প্রকাশ ছিল শুধু পেশাগত উদ্যোগ নয়, বরং নিজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সাহসী প্রচেষ্টা। ফজলে লোহানী সেই পথেই এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।
সাংবাদিকতা তাঁকে নিয়ে যায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও। যুক্তরাজ্যে গিয়ে তিনি বিবিসিতে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও প্রকাশভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল বলে মনে করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে তিনি আবার যুক্ত হন সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর জীবন ছিল বহুমুখী প্রতিভার এক ধারাবাহিক যাত্রা। তিনি কেবল সংবাদ পরিবেশন করতে চাননি; সংবাদ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের জীবন এবং চারপাশের অসংগতিগুলো নিয়েও ভাবতে চেয়েছিলেন।
তবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ফজলে লোহানীর সবচেয়ে স্মরণীয় পরিচয় হয়ে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর উপস্থাপক হিসেবে। অনুষ্ঠানটি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অনন্য প্রকাশভূমি। সহজ কথায় কঠিন বিষয় তুলে ধরা, রসবোধের মধ্য দিয়ে সামাজিক অসংগতি সামনে আনা এবং দর্শককে চিন্তার খোরাক জোগানো এসব গুণ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
তাঁর উপস্থাপনায় ছিল না অযথা আড়ম্বর। ছিল সাবলীলতা, বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা এবং কথার ভেতর দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি যখন পর্দায় আসতেন, দর্শক শুধু একটি অনুষ্ঠান দেখতেন না; তাঁরা যেন পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলার অনুভূতি পেতেন। তাঁর বক্তব্যে কখনো হাসি ফুটত, কখনো নিজের সমাজকে নতুন করে দেখার তাগিদ তৈরি হতো। এভাবেই তিনি টেলিভিশনকে নিছক বিনোদনের মাধ্যমের বাইরে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ফজলে লোহানী চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রযোজিত চলচ্চিত্র পেনশন তাঁর বহুমুখী আগ্রহের পরিচয় বহন করে। সাংবাদিকতা, সাময়িকী প্রকাশ, বিদেশে গণমাধ্যমে কাজ, টেলিভিশন উপস্থাপনা এবং চলচ্চিত্র সব মিলিয়ে তাঁর কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যে ভরা।
কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের জীবনও যে কতটা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, ফজলে লোহানীর মৃত্যু তারই এক বেদনাময় স্মারক। ১৯৮৫ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন হারায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। যে মানুষটি কথার জাদুতে দর্শকের মুখে হাসি ফোটাতেন, তাঁর অনুপস্থিতি রেখে যায় গভীর শূন্যতা।
আজও পুরোনো দিনের টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সাংবাদিকতার ইতিহাস কিংবা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কথা উঠলে ফজলে লোহানীর নাম ফিরে আসে। সময় বদলেছে, বদলে গেছে গণমাধ্যমের ধরন, মানুষের বিনোদনের অভ্যাসও হয়েছে ভিন্ন। কিন্তু মানুষের সঙ্গে কথা বলার যে সহজাত ক্ষমতা, বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপনা এবং সমাজকে প্রশ্ন করার যে সাহস সেসব গুণের আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না।
ফজলে লোহানী আমাদের মনে করিয়ে দেন, জনপ্রিয়তা শুধু পরিচিত মুখ হওয়ার নাম নয়; মানুষের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়ার নাম। একজন সাংবাদিকের কলম, একজন উপস্থাপকের কণ্ঠ কিংবা একজন সংস্কৃতিকর্মীর সৃজনশীলতা—সবই একসময় থেমে যায়। কিন্তু তাঁর কাজ যদি মানুষের চিন্তায় আলো জ্বালাতে পারে, তবে তাঁর প্রস্থানই শেষ কথা হয়ে থাকে না।
তাই ফজলে লোহানীকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের একজন জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে শেখায়, মেধা, মনন, সততা ও নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যায়।
মানুষ চলে যান, সময় এগিয়ে যায়, কিন্তু কিছু কণ্ঠস্বর স্মৃতির ভেতর অনন্তকাল বেঁচে থাকে। ফজলে লোহানী তেমনই এক কণ্ঠস্বর যাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের টেলিভিশনের এক স্বর্ণালি সময়, আর যাঁর স্মৃতি আজও নীরবে বলে যায়, প্রকৃত গুণী মানুষের বিদায় হয়, বিস্মৃতি নয়।