সুগন্ধি চালের বাজারে আগুন, কৃষকের লাভ কোথায়?

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

রপ্তানির অনুমতি, বাড়তি দাম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে বাড়তে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। যে চিনিগুঁড়া, কালিজিরা কিংবা কাটারীভোগ চাল একসময় বিশেষ উপলক্ষের খাবার হিসেবে তুলনামূলক সহজে কেনা যেত, সেই চাল এখন অনেক পরিবারের জন্য বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে চিনিগুঁড়া চালের দাম কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অথচ এই মূল্যবৃদ্ধির সুফল কতটা পাচ্ছেন সুগন্ধি ধানের উৎপাদক কৃষক সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।

সুগন্ধি চালের বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রপ্তানির অনুমতি, অভ্যরীন্তণ সরবরাহের ঘাটতি, মজুতদারি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ রপ্তানির সুযোগকে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, চাল কল মালিকদের কেউ কেউ বাজারে সরবরাহের সংকট ও মজুতের পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উৎপাদন বাড়ার পরও দেশের ভোক্তাদের বেশি দাম দিয়ে সুগন্ধি চাল কিনতে হচ্ছে কেন?

২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার খাদ্যনিরাপত্তার উদ্বেগে চাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নিষেধাজ্ঞার আওতায় সুগন্ধি ও সাধারণ দুই ধরনের চালই ছিল। এর আগে বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হতো।

২০২৫ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তী সরকার আবার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়। ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২৫ হাজার টন চাল রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়। পরে একই বছরের মে মাসে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম দুই ধাপে অনুমোদিত চালের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ হাজার ৯৫০ টন। রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজি চালের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার।

এরপর ২০২৬ সালেও রপ্তানির অনুমতি অব্যাহত থাকে। চলতি বছরের আগস্টে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে দুই ধাপে মোট ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুমোদিত পরিমাণের সবটুকু রপ্তানি হয়নি। ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মাত্র ২ হাজার ৪১৯ টন চাল রপ্তানি করেছিল বলে সরকারি তথ্যের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

অর্থাৎ, রপ্তানির অনুমোদন আর বাস্তবে রপ্তানি করা চালের পরিমাণ এক নয়। কিন্তু বাজারে দামের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গেলে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদিত চালের পরিমাণ বেশি হলে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনা বিবেচনায় মজুত ও বিক্রির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। আবার প্রকৃত রপ্তানি কম হলেও উৎপাদন, মৌসুমি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, চালকলের মজুত এবং খুচরা বিক্রেতার মুনাফার কারণে দাম বাড়তে পারে। তাই কেবল রপ্তানিকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করে পুরো সরবরাহব্যবস্থার হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

চলতি বছরের জুলাই মাসে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি চালের খুচরা দাম ছয় মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। আগস্টে চিনিগুঁড়া চালের দাম দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। পরে সেপ্টেম্বরে সরকার রপ্তানির অনুমোদিত পরিমাণ অর্ধেক করে দেয়। তবু অক্টোবরে বাজারে সুগন্ধি চালের দাম কেজিপ্রতি ২৪০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো থেকে বোঝা যায়, সুগন্ধি চালের বাজারে মূল্যচাপ নিয়ে নীতিনির্ধারকেরাও উদ্বিগ্ন। কিন্তু রপ্তানির অনুমোদন কমানোর পরও দাম কেন দ্রুত কমছে না, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কত চাল মজুত আছে, কতটা রপ্তানি হয়েছে, কতটা দেশের বাজারে বিক্রি করা হয়েছে এবং কোন পর্যায়ে কত মুনাফা যোগ হচ্ছে এসব তথ্য প্রকাশ না করলে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, ধান উৎপাদনকারী কৃষক কত দাম পাচ্ছেন? কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা, ধান শুকানো, সংরক্ষণ, চাল তৈরি, বাছাই, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ রয়েছে। ফলে কৃষকের বিক্রয়মূল্য এবং বাজারের খুচরা মূল্যের মধ্যে ব্যবধান থাকলেই অসাধু ব্যবসার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ব্যবধান অস্বাভাবিক হলে এবং তার যথাযথ ব্যাখ্যা না থাকলে মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট কিংবা অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া বিক্রয়মূল্যের তথ্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, চিনিগুঁড়া ও কাটারীভোগের মতো সুগন্ধি ধানের প্রতি মণের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল, সিটি গ্রুপ, ইস্পাহানী, মেঘনা, আকিজসহ বড় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম সুগন্ধি চাল রপ্তানি ও বাজারজাতকরণের আলোচনায় এসেছে।

সরকারের দায়িত্ব তাই দ্বিমুখী কৃষককে উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাকে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। সুগন্ধি চাল রপ্তানি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে দেশের বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনুমোদিত রপ্তানির পরিমাণ, প্রকৃত চালান, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মজুত এবং কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহমূল্যের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজারে সরবরাহের নির্ভরযোগ্য হিসাব তৈরি করতে হবে।

সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির দায় কোনো একটি সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান ও জবাবদিহি। কৃষক যদি ন্যায্য দাম না পান, আর ক্রেতাকে যদি কয়েক গুণ বেশি মূল্য দিতে হয়, তাহলে মাঝের সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় অসংগতি রয়েছে, তা খুঁজে বের করতেই হবে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু চালের উৎপাদন বাড়ানো নয়; কৃষকের ন্যায্য আয় এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ