​উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপট ও সাধারণ মানুষের দন্ত স্বাস্থ্য অধিকার: একটি বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

​আমরা অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মতো উন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নই; বরং আমরা একটি উদীয়মান কিন্তু সীমাবদ্ধ সম্পদের উন্নয়নশীল দেশ। অথচ এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে দন্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অত্যাধিক ব্যয়বহুল ও উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক করার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার আড়ালে রাষ্ট্রস্বীকৃত ডিপ্লোমা সনদপ্রাপ্ত ডেন্টাল প্রফেশনালদের ভূমিকা সংকুচিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা সরাসরি সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিপরীতে কাজ করে।

​কেন তৃণমূল পর্যায়ে ডিপ্লোমা ডেন্টাল প্রফেশনালদের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং তাদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করা অপরিহার্য—তা নিম্নোক্ত বাস্তব তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা প্রয়োজন:

​১. চিকিৎসক-জনসংখ্যা অনুপাত ও গ্রামীণ বৈষম্য

​শহরাঞ্চল বনাম গ্রামাঞ্চলের বৈষম্য: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০% থেকে ৬৫% মানুষ গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে বসবাস করেন। অথচ বিশেষজ্ঞ ও উচ্চতর ডিগ্রিধারী দন্ত চিকিৎসকদের ৮০%-এরও বেশি অবস্থান করছেন বিভাগীয় ও বড় বড় শহরগুলোতে।
​সেবার শূন্যতা: গ্রামাঞ্চলে প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের জন্য একজন রেজিস্টার্ড বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাওয়াও কঠিন। এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করে সাধারণ মানুষের দন্ত ব্যথায় প্রথম পাশে দাঁড়ান রাষ্ট্রস্বীকৃত ডিপ্লোমাধারীরা।

​২. প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সাশ্রয়
​‘প্রিভেন্টিভ কেয়ার’ বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রাইমারি হেলথ কেয়ার মডেল অনুযায়ী, যেকোনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ৮০% রোগই প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করা সম্ভব।

​খরচের তফাত: ​দাঁতের প্রাথমিক ক্ষয় (Caries) প্রাথমিক পর্যায়ে সামান্য খরচে ফিলিং বা স্কেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধান করা যায়।
​কিন্তু প্রাথমিক সেবার সুযোগ না পেয়ে জটিল রূপ নিলে (যেমন- রুট ক্যানেল, ক্যাপ বা সার্জারি) তার খরচ সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে।
​কাদের ক্ষতি?: প্রাথমিক পর্যায়ে ডিপ্লোমা ডেন্টিস্টরা রোগীকে সেবা দিলে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার টাকা সাশ্রয় হয়। ডিপ্লোমাধারীদের বাধা দিলে আলটিমেটলি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ রোগী, আর লাভবান হয় ব্যয়বহুল প্রাইভেট বাণিজ্যের অংশীদাররা।

​৩. বিশ্বমানের মডেলে ‘মিড-লেভেল হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার’
​বিশ্বের বহু দেশে (এমনকি অনেক উন্নত দেশেও) Auxiliary Dental Personnel বা Dental Therapists / Hygienists-দের মাধ্যমে প্রাথমিক দন্ত চিকিৎসা পরিচালনা করা হয়:
​দক্ষ মানবসম্পদ: রাষ্ট্র কোটি টাকা খরচ করে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট পরিচালনা করছে। রাষ্ট্রস্বীকৃত এই সনদধারীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সঠিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনলে তারা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় বড় অবদান রাখতে পারে।
​পেশাগত মর্যাদা বনাম বাধা: তাদের লাগাম টেনে ধরা বা তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য বিনিয়োগকে অবমূল্যায়ন করা।

​আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি ও আহ্বান
​১. তৃণমূলের সেবা সচল রাখা: মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের হাতের নাগালে স্বাস্থ্যসেবা রাখতে ডিপ্লোমা ডেন্টিস্টদের উপযুক্ত আইনি সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।
২. দক্ষতা বৃদ্ধি: ডিপ্লোমাধারীদের প্রতিপক্ষ না ভেবে তাদের ধারাবাহিক উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও রিফ্রেশার কোর্সের মাধ্যমে আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
৩. ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট বন্ধ করা: চিকিৎসার নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হোক স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য।

​দন্ত স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সুবিধাবঞ্চিতy সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রস্বীকৃত ডিপ্লোমা সনদ প্রাপ্তদের সঠিকভাবে কাজে লাগানোই সময়ের দাবি। রাহুর কবল থেকে মুক্ত হোক তৃণমূলের দন্ত সেবা; সুস্বাস্থ্য পৌঁছাক দেশের প্রতিটি প্রান্তে, সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়।

লেখক – মো: মোসাফিকুর রহমান, এম পি এইচ (ডেন্টিস্ট্রি), ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ এশিয়া)
বিএসসি ইন ডেন্টিস্ট্রি, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ডিপ্লোমা ইন ডেন্টিস্ট্রি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ