মফস্বলে শৈশব কাটানো আমার মন শিক্ষক বলতে কল্পনা করত বইপত্র হাতে নিয়ে করিডোর ধরে হেঁটে চলা আদর্শ কোনো অবয়ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসে ঢুকলেন তেমনই একজন, হামীম কামরুল হক। গায়ে ছিমছাম একখানা শার্ট, হাতে কিছু বই এবং চোখ ভর্তি উদ্দীপনা। আমরা ছিলাম তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ততদিনে সকলপ্রকার ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়নি, এখনও কারও কারও আসা বাকি। সব মিলিয়ে হয়ত ২৮ জন মতো হব আমরা। আল বেরুনী হলের বিপরীতে অবস্থিত যে ভবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকে আমাদের পদচারণার সূচনা। ভবনের এ অংশটুকুতে শুধু আমাদেরই চলাচল। করিডোর জুড়ে গুটিকয়েক মানুষের হৈ-হুল্লোড়, কোলাহল। সেই কোলাহল দিনদিন আরো অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে আমাদের শিক্ষকদের সাহচর্যে।
প্রথম ক্লাসে এসে হামীম স্যার অনেকগুলো বইয়ের নাম লিখে দিলেন বোর্ডে। সেই থেকে শুরু হলো বই কেনার যাত্রা। কলেজ জীবনে বই কিনতাম শখ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তা হয়ে উঠল তাড়না। পড়তে হবে, জানতে হবে। দেখতে হবে কী আছে তাতে। এত এত বই! সব বই কিনে উঠতে না পারলেও নামটা জানা হতো। লেখক সম্পর্কে জানা হতো। তখন অবাক লাগত স্যার এত বইয়ের যোগসূত্র বের করতেন কীভাবে! বই ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে কখন যে এরসাথে গভীর অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছে টের পাইনি। স্যারের মুখে শুনতে শুনতে বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক টেক্সট থেকে শুরু করে নানান চিন্তকরা পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন। নতুন বিষয়, এর আগে কোনো ব্যাচ নেই, বের হয়ে কোথায় যাব বা কী করব তা কখনো মনে হয়নি। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যেত সকালের প্রথম ক্লাসটি হামীম স্যারের। সবসময় আমরা প্রায় সবাই-ই ক্লাসে উপস্থিত থাকতাম। স্যার কেমন ক্লাস নিতেন সে কথার উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, এত এত ক্লাস করার পরও কখনো বিরক্ত লাগেনি। সবসময়ই মনে হতো কিছু নতুন শিখতাম। নতুন একটা বই, নতুন কোনো উক্তি, নতুন কোনো গল্প, কিছু না কিছু থাকতই। স্নাতকোত্তরের সময় প্রতিদিন সকালে ক্লাস শুরু হতো স্যারের কবিতা পাঠ দিয়ে। জীবনানন্দ দাশ, ভাস্কর চক্রবর্তী, শরৎ কুমার মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুবিমল মিশ্র, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার সহ নাম জানা সাহিত্যিকেরা যেমন আরো গভীর ভাবে চলে আসত আমাদের সামনে, তেমনি নাম না জানা বহু লেখকদের স্যার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। মোহাম্মদপুরের স্যারের বাসার সিলিং ছোঁয়া বইয়ের সারি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল একবার। একজন মানুষ অধ্যবসায় আর সাধনার স্বরূপ দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম সেদিন। বাংলা সাহিত্য বা ইংরেজি সাহিত্য বলতে আলাদা কোনোকিছু কখনো চোখের সামনে উদয় হয়নি। স্যার এমনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যে মনে হতো যে গোটা বিষয়টা শুধুই সাহিত্য। এখানে আলাদা কোনো ভাগ আর নেই। বিশ্বসাহিত্যের এরচেয়ে ভালো পরিচয়মূলক পাঠ দেওয়া হয়ত সম্ভব ছিল না।
প্রচুর ক্লাস আর লেখালেখির প্রয়াসের ভিড়ে ক্লান্ত হয়ত স্যার হতেন, তবে আমরা দেখিনি। ৯টা ২৫ এর ক্লাস মানে স্যার ৯টা ২০ এ তৈরি হয়ে থাকতেন। স্যারের সময় জ্ঞানের কথা তার যেকোনো শিক্ষার্থী মাত্রই জানে। সবসময় হাস্যোজ্জ্বল, নিজের জগতে মগ্ন এ মানুষটি রেগে গেলে হতো মুশকিল। তবে সে রাগ স্থায়ী হতো না কখনো। আবার কখনো মনে হতো খুব দরদ দিয়ে বিচার করছেন সবকিছু। রাগের ক্ষেত্রে যত জলদি রাগতেন, তত জলদি ভুলেও যেতেন। একবার মনে পড়ে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে স্যারের রুমে গিয়েছি। শুধু গিয়ে দাঁড়িয়েছি, তখনও কোনো কথা বলিনি। দেখে কি বুঝলেন জানি না। কয়েকদিনের নির্ঘুম রাতের ছাপ হয়ত চোখেমুখে দেখতে পেয়েছিলেন কিনা। হঠাৎ করে বলে উঠলেন, “জীবনে এমন মানুষকে সঙ্গী করতে হবে, যে নিজেকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে, বুঝেছো”। তারপর সেদিন আর কি কথা হয়েছিল, তা আর আজ মনে পড়ে না। প্রায় ৮ বছরের বেশি সময় ধরে স্যারকে সামনাসামনি দেখে আসছি। এ দীর্ঘ সময়ে অসংখ্যবার স্যারের কাছে বকা খেয়েছি, স্নেহ পেয়েছি, জীবনের নানান জটিলতার মোড়ে কখনো কখনো স্যারের বহু কথা আলো হয়ে ধরা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সবচেয়ে বেশি ক্লাস করেছি হামীম স্যারের৷ শুধু প্রথম বর্ষে হামীম স্যারের যত ক্লাস করেছি, তত ক্লাস সম্ভবত আর কোনো ব্যাচ না আর করেছে বা করতে পারবে। স্যারের আগ্রহ এবং উদ্দীপনা আমাদের মাঝেও প্রবাহিত হয়েছিল নিশ্চয়ই। বিশেষ কোনো গল্প বা আসর জমানোর মতো স্মৃতির চেয়েও সবচেয়ে বেশি দাগ কাটার মতো বিষয় হলো স্যারের একাগ্রতা। একজন মানুষের লেখক হয়ে ওঠার প্রচেষ্টার একান্ত নিবিড় পথচলা। নিয়মের মধ্যে দিয়েই নিজেকে সবচেয়ে বেশি স্বাধীন করে তুলেছেন স্যার।