আজ জর্জ অরওয়েলের প্রয়াণ দিবস। ১৯০৩ সালে ভারতের বাংলা প্রদেশে জন্ম নেওয়া এরিক আর্থার ব্লেয়ার ওরফে ‘জর্জ অরওয়েল’ ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি লন্ডনে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জর্জ অরওয়েল তাঁর ‘হোয়াই আই রাইট’ প্রবন্ধে বলেছেন যে, তিনি ‘রাজনৈতিক লেখাকে একটি শিল্পে পরিণত করতে’ চেয়েছেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে তিনি চারটি উপন্যাস রচনা করলেও তাঁর আসল প্রতিভা গতানুগতিক কথাসাহিত্যে নিহিত ছিল না। তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর প্রবন্ধসমূহ এবং ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ নামের তাঁর আধা-আত্মজীবনীমূলক প্রকরণগ্রন্থে তিনি যে তথ্যচিত্র ও শৈলী গড়ে তুলেছেন, তা উপন্যাসে বিন্যাসের জন্য অনুপযুক্ত। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, রাজনৈতিক প্রশ্নসমূহ অরওয়েলকে গভীরভাবে আগ্রহী করে তুলেছিল। ১৯৩০-এর দশকে রাজনীতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়, এবং সেই সাথে ইংরেজ উগ্রপন্থী থেকে তাঁর অনন্য, ভিন্নকেন্দ্রী সমাজতন্ত্রের দিকে তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র যাত্রাও।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে খুব অল্প বয়সে, ইটন কলেজে পড়াকালে অরওয়েল যুদ্ধের বিকৃত জাতীয়তাবাদ এবং উগ্র প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন, যা ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকে একটি নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯২০-এর দশকের তরুণ প্রজন্ম ইংল্যান্ডকে যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া ‘বুড়োদের’ ঘৃণা করত এবং যুদ্ধ-পূর্ব প্রজন্মের বিশ্বাসযোগ্য সমস্ত মূল্যবোধ প্রত্যাখ্যান করত। অরওয়েল বলেছেন, সেই সময়টিতে আদতে তিনি ছিলেন একাধারে একজন উন্নাসিক ও বিপ্লবী।
তরুণ বয়েসে জর্জ অরওয়েল
“আমি অর্ধেক সময় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সমালোচনায় এবং বাকি অর্ধেক সময় বাস-কনডাক্টরদের অশিষ্টতার প্রতি ক্রোধ প্রকাশে ব্যয় করেছি বলে মনে হয়”। জীবনের এই পর্যায়ে অরওয়েলের রাজনৈতিক ধারণাসমূহ মূলত অপরিণত ছিল, যদিও তিনি বলেন, বেশিরভাগ তরুণদের ন্যায় তিনি তখন সমাজতন্ত্রের প্রেমে পড়েছিলেন। স্কুল জীবনে তিনি সকল ধরনের কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তাঁর ‘দ্য রোড টু উইগান পিয়ার’ গ্রন্থে তিনি সেই বিষয়টিকে বলেছেন, ‘বার্ধক্যের বিরুদ্ধে তারুণ্যের বিদ্রোহ’। তার বিদ্রোহের মূলে ছিল এমন এক বিশ্বাস, যার সাথে তিনি খাপ খাইয়ে নিতে পারতেন না। ধনী, নবীন ধনী সহপাঠীদেরকে তাঁর অপছন্দ করার বিষয়টি ছিল তাঁর সেই কর্তৃত্ববাদ-বিরোধী বৌদ্ধিক মনোভাবের একটি রূপ। তার প্রাথমিক রাজনৈতিক মতামতসমূহ সমানাধিকারবাদের একটি সহজ রূপ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
আদতে অরওয়েলের রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিপক্কতা বোঝা যায় বার্মায় ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর পুলিশ কর্মকর্তা পদে চাকুরি করার পর থেকে। ১৯২১ সালে ইটন থেকে স্নাতক হওয়ার পর মেধাবী তরুণদের অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে যাওয়ার ঐতিহ্যবাহী পথ অনুসরণ না করে অরওয়েল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। তিনি তখন তরুণ ছিলেন এবং রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর একজন প্রখর ভক্ত ছিলেন। তখনকার ভারতবর্ষ অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যময় আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সম্ভবত ইটনে তাঁর মাঝারি মানের অবদানের পর ইমপেরিয়াল পুলিশে যোগদান করার বিষয়টি তাঁর পিতা রিচার্ড ওয়েমেসলি ব্লেয়ারকে খুশি করার একটি উপায়ও ছিল।

তরুণ জর্জ অরওয়েল সহোদরদের সাথে
বার্মায় অরওয়েলের কর্তৃত্ববাদ-বিরোধী বিদ্রোহ তীব্র সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থানে রূপ নেয়। তার সমানাধিকারবাদ এখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং এর প্রতিনিধিত্বকারী সবকিছুর প্রতি ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়েছে। পুলিশ হিসেবে চাকুরি সম্পর্কিত তাঁর প্রবন্ধ এবং অন্যান্য লেখায় উল্লিখিত তথ্য থেকে বোঝা যায়, অরওয়েল তাঁর প্রতি ঘৃণা করা লোকদেরও শাসন করার বিষয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি “দ্য রোড টু উইগান পিয়ার”-এর আত্মজীবনীমূলক দ্বিতীয় অংশে বলেন, “সাম্রাজ্যবাদকে ঘৃণা করতে হলে আপনাকে এর অংশীদার হতে হবে”।
অরওয়েলকে তাঁর ঊর্ধ্বতনরা অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাঁর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মনোভাব এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করেছিল। অরওয়েল বার্মিজ জনগণ এবং সাম্রাজ্যের অন্যান্য নিপীড়িত জাতিদের সাথে নিজেকে তুলনা করার চেয়ে বরং পুরো প্রক্রিয়াটিকে শাসকের চেয়েও বেশি অবমাননাকর বলে মনে করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, সাম্রাজ্যবাদীরা নিজের সাথেই প্রতারণা করে চলে যখন সে সভ্যতার কাজ করছে এমন ভাব দেখায়। তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদী “মুখোশ পরিধান করে এবং তার মুখোশটি তার সাথে মানানসই হয়ে ওঠে”। তাঁর ইটন কলেজের বন্ধু ক্রিস্টোফার হলিস লিখেছেন, পুলিশের চাকুরি ছাড়ার আগে যখন তিনি অরওয়েলের সাথে দেখা করেন, ইতোমধ্যেই তখন তিনি সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তের সমালোচক ছিলেন।
বার্মা সম্পর্কে তাঁর সেরা সৃষ্টি, ১৯৩৪ সালের ‘বার্মিজ ডেইজ’ উপন্যাসের পাশাপাশি ‘শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট’ এবং ‘আ হ্যাঙ্গিং’ শিরোনামের ধ্রুপদী প্রবন্ধ দুটিতে কেবল সাম্রাজ্যের প্রতি অরওয়েলের মোহভঙ্গই নয়, বরং তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রগতিবাদের বিকাশও অনুসরণ করা যেতে পারে। পুলিশের চাকুরিতে তিনি কেবল যা করছিলেন তা নয়, তিনি যা হয়ে উঠছিলেন তাও ঘৃণা করতে শুরু করেন। তিনি ‘শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট’-এ যেমন লিখেছেন: “আমার মনের এক অংশে আমি ব্রিটিশ রাজকে একটি অলঙ্ঘনীয় অত্যাচার হিসেবে ভাবতাম… অন্য অংশে আমি ভেবেছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো আনন্দ হলো একজন বৌদ্ধ পুরোহিতের পেটে বেয়নেট চালানো”।

জর্জ অরওয়েল
ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের পদ থেকে পদত্যাগ করার সময়ে অরওয়েলের রাজনৈতিক বিকাশ, ইটন থেকে সদ্য আসা একজন যুবক হিসেবে যে হতাশাজনক ক্রোধ অনুভব করেছেন, তার বাইরে খুব বেশি এগোয়নি। তিনি সাম্রাজ্যকে ঘৃণা করতেন, কর্তৃত্বের সাথে মোকাবিলা করতে অসুবিধা হতো এবং ভাসা ভাসাভাবে তিনি ছিলেন চরমপন্থী। তার রাজনৈতিক ধারণাসমূহ অপরিণত ছিল। সেই সময়ে সাম্রাজ্যকে ঘৃণার চক্ষে দেখতে শুরু করেন অরওয়েল। সেই সাম্রাজ্যের শাসন প্রয়োগে তাঁর নিজ কৃতকর্মের কারণে ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি কেবল একটি বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন, তা হলো ‘অপরিমেয় অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে’। তাই ‘দ্য রোড টু উইগান পিয়ার’ গ্রন্থে অরওয়েল যা করতে চেয়েছেন তা হলো ‘নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়া, নিপীড়িতদের মধ্যে নেমে পড়া, অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে নিপীড়িতদের পক্ষে থাকা’।
১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে অরওয়েল লেখক হয়ে উঠছিলেন। সেই বছরগুলোতে তিনি তিনটি উপন্যাস, অসংখ্য প্রবন্ধ, গ্রন্থ পর্যালোচনা, এবং সমাজের প্রান্তিক জীবনের উপর একটি আধা-আত্মজীবনীমূলক প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ প্রকাশ করেন। উপন্যাসগুলো ছিল চিরাচরিত কল্পকাহিনির রচনা, যার কোনও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রবণতা ছিল না। যদিও এগুলো সবই এক ধরনের অস্পষ্ট উগ্রবাদ এবং সমাজের গতিপথের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ গ্রন্থ থেকে দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষদের পক্ষে সাধারণ পক্ষপাতিত্ব ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক অভিপ্রায় বের করা কঠিন হবে। তার প্রাথমিক লেখার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যায়ের প্রতি এক অনির্দিষ্ট ক্ষোভ ছিল। অরওয়েল তার সময়ের ইংরেজ সমাজের বিরুদ্ধে রাগান্বিত এবং বিদ্রোহী ছিলেন, কিন্তু ঔপন্যাসিক অ্যান্থনি পাওয়েল যেমনটি চতুরতার সাথে উল্লেখ করেছেন: “বেশিরভাগ রাজদ্রোহীর মতো তিনি যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছিলেন তার অর্ধেকেরও বেশি প্রেমে পড়েছিলেন”।

জর্জ অরওয়েলের বইয়ের প্রচ্ছদসমূহ
বামপন্থী সমাজতন্ত্রী প্রকাশক ভিক্টর গোলানকজ অরওয়েলকে ইংল্যান্ডের উত্তরের দরিদ্র ও বেকারদের অবস্থা অধ্যয়ন করতে বলেন। তবে তার আগেই অরওয়েলের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক বিরূপতার বাইরে চলে যায়। ১৯৩৬ সালের জানুয়ারিতে অরওয়েল মন্দায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওই এলাকাটি অনুসন্ধান করার জন্য উত্তরাঞ্চল ভ্রমণ করেন। এটি ছিল তার জীবনের এক মারাত্মক বাঁক। তাঁর জীবনীকার বার্নার্ড ক্রিক অরওয়েলের জীবনের এই সময়টিকে ‘দ্য ক্রুশিয়াল জার্নি’ বলে অভিহিত করেছেন।
১৯৩৬ সালের মধ্যে অরওয়েল পাঠকের সাথে সরাসরি কথা বলার স্বতন্ত্র অনুভূতি আয়ত্ত করেছিলেন, যা তার লেখাকে অনন্য করে তুলেছিল। ছয় বছরে তিনি লেখক হিসেবে অনেক দূর এগিয়ে এসেছিলেন। ‘দ্য রোড টু উইগান পিয়ার’ গ্রন্থের দ্বিতীয়ার্ধ প্রকাশক গোলানকজ বিব্রত বোধ করেছিলেন। অরওয়েল যুক্তি দিয়েছিলেন, সমাজতন্ত্রই ইংল্যান্ডের সমস্যার সমাধান, জনসাধারণকে বোঝাতে প্রথমে বিশ্লেষণ করতে হবে কেন এই আন্দোলন ব্যাপক অনুসারী আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি লিখেছেন, এর উত্তর নিহিত আছে সমাজতন্ত্রীদের নিজেদের ত্রুটির মধ্যেই। তারা শ্রমিক শ্রেণি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। আরও খারাপ বিষয় হলো তারা শ্রমিক শ্রেণিকে নীচ ভাবতেন। অরওয়েল যে শ্রমিক শ্রেণিকে প্রকৃত সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে দাবি করেছিলেন, তার বিপরীতে, সমাজতন্ত্র এক অদ্ভুত ধরনের বুদ্ধিজীবী আকৃষ্ট করেছিল, যারা জনগণের কাছ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। এক বিখ্যাত অনুচ্ছেদে তিনি তাদেরকে দুর্বল দাঁতের ফলের রস পানকারী, প্রতারক তাবিজ বিক্রেতা এবং নগ্নতার অস্বাস্থ্যকর মিশ্রণ বলে অভিহিত করেছিলেন।
সমানাধিকারবাদের উপর গুরুত্বারোপ করার কারণেই অরওয়েলকে তাঁর অনেক সহকর্মী সমাজতন্ত্রীদের থেকে আলাদা করেছিল। তিনি ভেবেছেন তারা ক্ষমতা চায়, এবং তিনি ভয় পেতেন যে তারা শ্রমিক শ্রেণির সর্বোত্তম স্বার্থে ক্ষমতাকে ব্যবহার করবে না। অরওয়েলকে বিংশ শতাব্দীর একজন ইউটোপিয়ান সমাজতান্ত্রিক হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে, কারণ তিনি ক্ষমতা উপাসনার উপর ভিত্তি করে সমস্ত বৌদ্ধিক সূত্রকে অবিশ্বাস করেছিলেন। “দ্য রোড টু উইগান পিয়ার” অরওয়েলের সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্টতার প্রমাণ দিলেও স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় স্পেনে তাঁর অভিজ্ঞতা চিন্তাভাবনায় আরেকটি মাত্রা যোগ করে, যা কমিউনিজমের প্রতি এক ব্যাপক অবিশ্বাস।

জর্জ অরওয়েল
১৯৩৭ সালের গোড়ার দিকে অরওয়েল রিপাবলিকানদের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য স্পেনে যান। তিনি কাতালোনিয়া ফ্রন্টে মোতায়েন থাকা ট্রটস্কিবাদী-নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী ‘মার্কসবাদী ঐক্যের শ্রমিক দল’ ‘পাউম’-এর অন্তর্ভুক্ত হন। ‘পাউম’ ছিল একটি বামপন্থী ট্রটস্কিবাদী সংগঠন যা স্পেনে স্ট্যালিনবাদী কমিউনিজমের বিরোধিতা করার জন্য ১৯৩৫ সালে আন্দ্রেউ নিন কর্তৃক গঠিত হয়। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ‘পাউম’ মিলিশিয়ারা রিপাবলিকানদের পক্ষে লড়াই করে কিন্তু দ্রুত স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে দলাদলিতে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায় স্পেনের কমিউনিস্ট পার্টি পাউমের আন্দোলন দমন করে। ‘পাউম’-এর সদস্য জর্জ অরওয়েল এই দমনের সাক্ষী ছিলেন, যা তার অনেক কর্তৃত্ববাদ-বিরোধী লেখাকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করে। পাউমের সদস্য হিসেবে সেখানে অরওয়েল ছয় মাস অবস্থান করেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধ তাকে চিরতরে বদলে দেয়। তাঁর প্রথম বার্সেলোনা সফরে তিনি এমন একটি সমাজ দেখে রোমাঞ্চিত হন যেখানে শ্রমিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং যেখানে শ্রেণিগত বৈষম্য অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল। তিনি স্পেনের সামরিক পরিবেশ উপভোগ করেন, প্রায় ১০০ দিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটান।
স্পেনে তাঁর অবস্থানের শেষের দিকে তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে গলা বরাবর গুলি করা হয় এবং যুদ্ধ থেকে বহিষ্কার করা হয়। অরওয়েল যখন স্পেন যান তখন রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যে তীব্র বিভাজন বুঝতে পারেননি এবং তিনি সমস্ত রিপাবলিকান শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কমিউনিস্টদের দৃঢ়সংকল্পকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। ‘মার্কসবাদী ঐক্যের শ্রমিক দল’ পাউমে তাঁর সহকর্মীদের বস্তুনিষ্ঠভাবে ফ্যাসিবাদপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তারপর নির্মমভাবে নির্মূল করা হয়। এইসব ঘটনায় তিনি হতবাক হয়ে যান। স্পেনে থাকাকালীন অরওয়েল স্থায়ী একটি ধারণা অর্জন করেন, প্রকৃত সমাজতন্ত্র সম্ভব, কিন্তু কমিউনিস্টরা যে কোনও বামপন্থী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অপারগ মনে হলেই ধ্বংস করে ছাড়বে। ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে অরওয়েল ক্ষুব্ধ হন এবং বলার চেষ্টা করেন, স্ট্যালিনের এজেন্টরা স্পেনের বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। কমিউনিস্টদের সাথে সহযোগিতা না করা দলগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে ফ্যাসিবাদী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
রাজনৈতিক কারণে স্পেনের যুদ্ধকে যেভাবে বিকৃত করা হয়েছিল তাতে অরওয়েল বিরক্ত হন। তিনি প্রথমবারের মতো ভয় পেতে শুরু করেন, বস্তুনিষ্ঠ সত্যের ধারণাটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি পরে লিখেছেন, ‘আমি মহান যুদ্ধের খবর দেখেছি’, ‘যেখানে কোনও লড়াই হয়নি, এবং যেখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছিল সেখানে সম্পূর্ণ নীরবতা… আমি লন্ডনের সংবাদপত্রগুলোকে এই বানোয়াট তথ্যগুলো বিক্রি করতে দেখেছি এবং আগ্রহী বুদ্ধিজীবীরা কখনও ঘটেনি এমন ঘটনাগুলির উপর আবেগপূর্ণ উপরিকাঠামো তৈরি করছেন’।

বিবিসিতে জর্জ অরওয়েল
অরওয়েল দেখলেন, স্পেন সম্পর্কে তাঁর লেখা নিবন্ধ এবং পর্যালোচনাগুলো নিউ স্টেটসম্যানের মতো শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী জার্নালগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। সম্পাদক কিংসলে মার্টিন তখন অরওয়েলের একটি স্প্যানিশ প্রবন্ধ প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান এই যুক্তিতে যে, এটি ‘সমস্যা সৃষ্টি করবে’। তিনি অরওয়েলকে স্পেন সম্পর্কে একটি বই পর্যালোচনা করার প্রস্তাব দিলেন কিন্তু পরে অরওয়েলের পর্যালোচনাও প্রত্যাখ্যান করেন। মার্টিনকে যা কষ্ট দিয়েছিল তা হলো অরওয়েলের এই জোর যে স্পেনে ফ্যাসিবাদ এবং কমিউনিজম ‘মাত্রায় ভিন্ন, ধরনের নয়’। অরওয়েল কখনও মার্টিনকে ক্ষমা করেননি, যাকে তিনি ‘ক্ষয়প্রাপ্ত উদারপন্থী’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। বহু বছর পরে অরওয়েল এবং ম্যালকম মুগেরিজ মধ্যাহ্নভোজ করছিলেন এবং অরওয়েল আসন পরিবর্তন করতে বলেন। যখন মুগেরিজ জিজ্ঞাসা করলেন কেন, অরওয়েল বললেন, মার্টিন বিপরীত টেবিলে ছিলেন এবং তিনি তার দুর্নীতিগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলেন না।