এক ব্যাগ রক্তে বাঁচে একটি প্রাণ, মরণোত্তর চক্ষুদানে ফিরে আসে পৃথিবীর আলো

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? অর্থ, সম্পদ, খ্যাতি, নাকি মানুষের ভালোবাসা? হয়তো এসবের সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে অন্য একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর আনন্দ। পৃথিবীতে এমন কিছু কাজ আছে, যার বিনিময়ে কোনো অর্থ পাওয়া যায় না, কোনো পদক বা স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না; অথচ সেই কাজের মহত্ত্ব মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং মরণোত্তর চক্ষুদান তেমনই দুটি মহৎ মানবিক উদ্যোগ। নিজের শরীরের সামান্য রক্ত দিয়ে যখন একজন মানুষ অন্য একজনের প্রাণ বাঁচান, আর মৃত্যুর পর নিজের চোখের কর্নিয়া দান করে যখন একজন অন্ধ মানুষের পৃথিবী দেখার সুযোগ তৈরি করেন, তখন মানবতার সৌন্দর্য যেন নতুন করে প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ থেকে ৪ নভেম্বর জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস পালন করা হয়। দিবসটির মূল তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মধ্যে রক্তদান ও মৃত্যুর পর চক্ষুদানের মানসিকতা তৈরি করা। এই আয়োজন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না।

এক ব্যাগ রক্তের মূল্য একটি জীবন

একটি দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার, প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ, থ্যালাসেমিয়া কিংবা ক্যানসারের চিকিৎসা যেকোনো মুহূর্তে একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন হতে পারে কয়েক ব্যাগ রক্ত। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগী কিংবা সন্তানের জন্য রক্তের সন্ধানে ছুটে বেড়ানো অসহায় স্বজনদের কাছে এক ব্যাগ রক্ত তখন অমূল্য সম্পদ।

একবার ভাবুন, কোনো হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে একজন বাবা তাঁর সন্তানের জন্য রক্ত খুঁজছেন। মায়ের চোখে অশ্রু, স্বজনদের কণ্ঠে আকুতি কেউ একজন এগিয়ে আসবেন, একটু রক্ত দেবেন, বাঁচিয়ে দেবেন তাঁদের প্রিয় মানুষটিকে। সেই মুহূর্তে একজন স্বেচ্ছায় রক্তদাতার উপস্থিতি শুধু একটি ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করে না, একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার আশাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

রক্তের কোনো বিকল্প নেই। কৃত্রিমভাবে রক্ত তৈরি করা যায় না। সুস্থ মানুষের শরীর থেকেই এই জীবনরক্ষাকারী উপাদান সংগ্রহ করতে হয়। অথচ সামান্য সচেতনতা ও সদিচ্ছার অভাবে অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে রক্ত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বেচ্ছায় রক্তদান তাই কেবল একটি সামাজিক কাজ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের পরিচয়।

মৃত্যুর পরও আলো ছড়ানোর সুযোগ

রক্তদানের পাশাপাশি মরণোত্তর চক্ষুদান আরও গভীর মানবিক অনুভূতির নাম। একজন মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পর তাঁর চোখের কর্নিয়া অন্য একজনের অন্ধকার জীবনে আলো ফিরিয়ে দিতে পারে। যে মানুষটি হয়তো বছরের পর বছর পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পাননি, প্রিয়জনের মুখ চিনতে পারেননি, সন্তানের হাসি কিংবা প্রকৃতির রং উপভোগ করতে পারেননি, একজন চক্ষুদাতার কারণে তাঁর জীবনে ফিরে আসতে পারে নতুন সম্ভাবনা।

একবার কল্পনা করুন, একজন মা মৃত্যুর পরও তাঁর চোখের আলো দিয়ে অন্য কোনো মাকে সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন। একজন বাবা পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার পরও অন্য একজন বাবাকে তাঁর সন্তানের মুখ দেখার আনন্দ ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এর চেয়ে বড় মানবিক প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

মরণোত্তর চক্ষুদানের ক্ষেত্রে মূলত কর্নিয়া সংগ্রহ করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে এ কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। মৃত্যুর পর দ্রুত কর্নিয়া সংগ্রহের প্রয়োজন হয়। তাই এ বিষয়ে আগে থেকেই পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে রাখা এবং সম্মতি ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা করে রাখা জরুরি।

সন্ধানীর হাত ধরে মানবিক আন্দোলন

বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলনের ইতিহাসে সন্ধানীর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৭৮ সালের ২ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে সংগঠনটি প্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে। পরবর্তী সময়ে এই দিনটিকে জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ও চক্ষুব্যাংক। মানবসেবায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে সংগঠনটি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করে।

এই ইতিহাস কেবল একটি সংগঠনের সাফল্যের গল্প নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের মানবিক দায়িত্ববোধ, স্বেচ্ছাসেবা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আমাদের প্রত্যেকের কিছু দায়িত্ব আছে

আজও দেশে নিরাপদ রক্তের প্রয়োজন রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি মুহূর্তে রক্তের জন্য স্বজনদের ছোটাছুটি করতে হয়। অন্যদিকে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত অনেক মানুষ অপেক্ষায় থাকেন নতুন করে পৃথিবী দেখার সুযোগের জন্য। এই বাস্তবতায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা প্রয়োজন।

তবে রক্তদানের আগে স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নিরাপদ রক্ত সংগ্রহের নিয়ম মেনে চলতে হবে। একইভাবে চক্ষুদানের সিদ্ধান্ত জীবদ্দশায় পরিবারকে জানিয়ে রাখা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। কুসংস্কার, ভয় কিংবা ভুল ধারণার কারণে যেন কেউ এই মহৎ উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে না যান।

বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে রক্তদান ও চক্ষুদান বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিটি এলাকায় স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং চক্ষুদানে আগ্রহীদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

২ থেকে ৪ নভেম্বরের এই আয়োজন আমাদের সামনে একটি মানবিক প্রশ্ন তুলে ধরে  আমরা কি শুধু নিজের জন্য বাঁচব, নাকি অন্যের জীবনেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছড়িয়ে দেব?

মৃত্যু মানুষের জীবনের অনিবার্য সত্য। কিন্তু মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসা, মানবিকতা ও অবদান বেঁচে থাকতে পারে। এক ব্যাগ রক্ত হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে কোনো মায়ের সন্তানকে, কোনো স্ত্রীর স্বামীকে, কোনো শিশুর বাবাকে। আর একটি কর্নিয়া ফিরিয়ে দিতে পারে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর আলো।

আসুন, আমরা রক্তদানে এগিয়ে আসি, মরণোত্তর চক্ষুদানে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। আমাদের রক্তে বেঁচে উঠুক কোনো মানুষের জীবন, আমাদের চোখের আলোয় আলোকিত হোক অন্য কারও পৃথিবী। কারণ মানুষের জন্য মানুষের এই ভালোবাসাই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

মানুষ বেঁচে থাকে শুধু নিজের জীবনে নয়, বেঁচে থাকে অন্যের জীবন বাঁচানোর মধ্য দিয়েও।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ