জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস

এক ব্যাগ রক্তে বাঁচুক প্রাণ, মৃত্যুর পর চোখের আলোয় বেঁচে থাকুক মানবতা।

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

মানুষের মৃত্যুর পরও কি বেঁচে থাকা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। কারও শরীরে প্রবাহিত হতে পারে আপনার দান করা রক্ত, আর আপনার মৃত্যুর পর দান করা চোখে অন্য কেউ দেখতে পারেন পৃথিবীর আলো, সবুজ প্রকৃতি কিংবা প্রিয়জনের মুখ। ভাবুন তো, একজন অচেনা মানুষের শরীরে আপনার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, আপনার দেওয়া রক্তে ফিরে আসছে কোনো মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ। আবার আপনার পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও আপনার চোখের আলোয় অন্য কেউ নতুন করে পৃথিবী দেখার স্বপ্ন পূরণ করছেন। এর চেয়ে বড় মানবিক অর্জন আর কী হতে পারে! মানুষের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকার মধ্যে নয়, বরং নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের জীবনকে সুন্দর করে তোলার মধ্যেই। স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান এমনই এক মহৎ মানবিক অঙ্গীকার, যেখানে এক ব্যাগ রক্ত হয়ে উঠতে পারে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন, আর মৃত্যুর পর দান করা চোখ হতে পারে অন্য কারও অন্ধকার জীবনে নতুন সূর্যোদয়।

জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস আমাদের সামনে সেই মানবিক দায়িত্বের কথাই নতুন করে তুলে ধরে। বাংলাদেশে ২ থেকে ৪ নভেম্বর এ উপলক্ষে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হয়। দিবসটির মূল তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ অন্য মানুষের বিপদে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী হবেন।

রক্ত মানুষের জীবনের অপরিহার্য উপাদান। দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, প্রসবকালীন জটিলতা, ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হয়। একজন মুমূর্ষু রোগীর স্বজন যখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ব্যাগ রক্তের জন্য আকুল আবেদন করেন, তখন তাঁদের কাছে রক্তের মূল্য পৃথিবীর সব সম্পদের চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। অনেক সময় কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয় একজন মানুষের বেঁচে থাকা কিংবা মৃত্যুর পরিণতি। অথচ সুস্থ একজন মানুষের শরীরের সামান্য রক্তই হতে পারে অন্য একজনের নতুন জীবনের আশ্রয়।

রক্তের কোনো কৃত্রিম বিকল্প নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ রক্ত সংগ্রহের জন্য সুস্থ মানুষের স্বেচ্ছায় রক্তদানই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি অনেক দূর এগিয়েছে। আধুনিক অস্ত্রোপচার, জটিল রোগের চিকিৎসা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবায় এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু এখনো মানুষের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে আরেকজন মানুষের রক্তের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের একটি বড় অংশ রক্তদানে এগিয়ে আসছেন। অনেক সংগঠন রক্তদাতাদের তথ্য সংরক্ষণ করে জরুরি সময়ে রোগীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত, নিরাপদ ও নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের ব্যবস্থা।

রক্তদান নিয়ে সমাজে এখনো কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, কর্মক্ষমতা কমে যায় কিংবা দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকতে হয়। বাস্তবে নির্ধারিত স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা পূরণ করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত দিলে সাধারণত স্থায়ী কোনো শারীরিক ক্ষতি হয় না। শরীর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হারানো রক্তের উপাদান পুনরায় তৈরি করে। তবে রক্তদানের আগে দাতার বয়স, ওজন, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সংক্রমণমুক্ত রক্ত নিশ্চিত করতে যথাযথ পরীক্ষা ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।

একজন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা শুধু একজন রোগীকে রক্ত দেন না, তিনি একটি পরিবারকে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মুহূর্তে আশার আলো দেখান। যে মা তাঁর সন্তানকে বাঁচানোর জন্য রক্ত খুঁজছেন, যে বাবা সন্তানের অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালের দরজায় অপেক্ষা করছেন, যে স্বজন দুর্ঘটনায় আহত প্রিয় মানুষটির জীবন ফিরে পাওয়ার প্রার্থনা করছেন তাঁদের কাছে একজন রক্তদাতা যেন অচেনা পৃথিবীর এক পরিচিত ফেরেশতা। অথচ এই মহৎ কাজের জন্য প্রয়োজন শুধু সামান্য সাহস, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ।

স্বেচ্ছায় রক্তদানের পাশাপাশি মরণোত্তর চক্ষুদানও মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পৃথিবীতে দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে আলো শুধু একটি অনুভূতি নয়, এটি জীবনকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ। প্রিয়জনের মুখ দেখা, সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা, বইয়ের পাতা পড়া কিংবা নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারা এসব সাধারণ বিষয়ও দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে অনেক সময় অধরা স্বপ্ন হয়ে থাকে। অথচ একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর দান করা কর্নিয়া অন্য একজনের জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারে দৃষ্টির সম্ভাবনা।

চোখের কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ পর্দা, যার মাধ্যমে আলো চোখের ভেতরে প্রবেশ করে। বিভিন্ন কারণে কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে একজন মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে দান করা সুস্থ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে চোখের সব ধরনের অন্ধত্ব কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। চোখের অন্যান্য অংশ বা স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই চিকিৎসা কার্যকর নাও হতে পারে। তাই চক্ষু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মরণোত্তর চক্ষুদানের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, একজন মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পরও অন্য একজনের জীবনে আলো ছড়িয়ে যেতে পারেন। মৃত্যুর পর তাঁর শরীরের একটি অংশ অন্য কারও জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। এটি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক উত্তরাধিকারের এক অসাধারণ উদাহরণ।

কিন্তু আমাদের সমাজে মরণোত্তর চক্ষুদান নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা, সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক দ্বিধা এবং মৃত্যুর পর শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা নিয়ে নানা ভয়ের কারণে অনেকে এ বিষয়ে আগ্রহী হলেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অথচ মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় অঙ্গ বা কর্নিয়া দানের বিষয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ মানুষের দ্বিধা দূর করতে পারে।

বিশেষ করে মৃত্যুর পর চোখ দানের ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতি, দাতার পূর্বঘোষণা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। এ বিষয়ে মৃত্যুর আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে রাখা উচিত। কারণ অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকায় কিংবা প্রয়োজনীয় যোগাযোগের তথ্য না জানায় সম্ভাব্য দান বাস্তবায়িত হয় না।

আমাদের দেশে রক্তদাতা ও কর্নিয়া দাতার সংখ্যা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে মানবিক স্বাস্থ্যশিক্ষার অংশ হিসেবে রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানের গুরুত্ব তুলে ধরা যেতে পারে। হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম সমন্বিতভাবে প্রচার চালাতে পারে। রক্তদাতাদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি, জরুরি রক্ত সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কর্নিয়া সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ তরুণদের মধ্যে রয়েছে উদ্যম, সাহস, মানবিকতা এবং সমাজ পরিবর্তনের শক্তি। একজন তরুণ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের পাশাপাশি অন্য দশজনকে উৎসাহিত করতে পারেন। একটি পরিবার মরণোত্তর চক্ষুদানের সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্ত আরও অনেক পরিবারকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এভাবেই ব্যক্তিগত সদিচ্ছা একসময় সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রক্তের জন্য কাউকে অসহায়ের মতো ছুটতে হবে না। এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে দৃষ্টিহীন মানুষ কর্নিয়ার অভাবে বছরের পর বছর অন্ধকারে কাটাবেন না। এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মৃত্যুর পরও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ অটুট থাকবে।

মনে রাখতে হবে, রক্তের গ্রুপের ভিন্নতা থাকলেও মানুষের হৃদয়ের ভাষা এক। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধা হতে পারে না। রক্তদানের সময় একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পরিচয় খোঁজেন না; খোঁজেন শুধু তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। একইভাবে মরণোত্তর চক্ষুদান কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, এটি সমগ্র মানবতার জন্য এক অনন্য উপহার।

জীবন একদিন শেষ হবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু মানুষের ভালো কাজ কখনো শেষ হয় না। একটি ব্যাগ রক্ত হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে কোনো মায়ের সন্তানকে, কোনো সন্তানের বাবাকে কিংবা কোনো পরিবারের স্বপ্নকে। আর মৃত্যুর পর দান করা দুটি কর্নিয়া অন্য মানুষের চোখে ফিরিয়ে দিতে পারে পৃথিবীর রং, আলো ও সৌন্দর্য। তাই জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় রক্তদান এবং মৃত্যুর পর মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার হোক আমাদের মানবিক পরিচয়।

আসুন, আমরা শুধু নিজের জন্য বাঁচার চিন্তা না করে অন্যের জীবন বাঁচানোর স্বপ্ন দেখি। রক্তদানের উপযুক্ততা থাকলে স্বেচ্ছায় রক্ত দিই, মৃত্যুর পর চক্ষুদানের ইচ্ছা থাকলে তা পরিবারকে জানিয়ে রাখি। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদ কিংবা অর্জনে নয়, বরং অন্য মানুষের জীবনে সে কতটুকু আলো ছড়িয়ে যেতে পেরেছে, তার মধ্যেই।

এক ব্যাগ রক্তে বেঁচে উঠুক একটি প্রাণ, আর মৃত্যুর পর দান করা চোখে নতুন করে আলো খুঁজে পাক আরেকটি জীবন। মানবতার এই অঙ্গীকারই হোক জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবসের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ