ফুটপাতের ছায়া অর্থনীতি: চাঁদার রাজত্ব, রাস্তায় অটোরিকশার জট

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

দেশের রাস্তাঘাট ও ফুটপাত ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। একদিকে ফুটপাতজুড়ে পণ্য বিক্রি, অন্যদিকে জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ। একই সঙ্গে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও তিন চাকার যানবাহনের ব্যবসা। এসব কার্যক্রমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হলেও এর বড় একটি অংশের পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাষ্ট্রের কাছে নেই। ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে জনসাধারণের চলাচল, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ সরবরাহে তৈরি হচ্ছে নানা সমস্যা।

ফুটপাতের অর্থনীতির আকার নিয়ে বিভিন্ন হিসাব সামনে এলেও দেশে এ খাতের দৈনিক মোট বেচাকেনার কোনো সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। প্রতিদিন প্রায় ১২৫ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি এবং বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের যে হিসাব আলোচনায় আসে এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি কোন হিসাব নেই। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হকারের সংখ্যা, পণ্য বিক্রি এবং তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ থেকে বোঝা যায়, ফুটপাতকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যের বিস্তার উল্লেখযোগ্য।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, রাজধানীতে আনুমানিক আড়াই থেকে তিন লাখ হকার রয়েছেন। তাঁদের মাধ্যমে পোশাক, জুতা, ফলমূল, খাবার, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ নানা পণ্য বিক্রি হয়। স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে এসব পণ্য তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পাইকারি ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র উৎপাদক ও গ্রামীণ কৃষকের সঙ্গে এই বাণিজ্যের যোগসূত্র রয়েছে। অর্থাৎ ফুটপাতের দোকান শুধু বিক্রেতার আয়ের উৎস নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি বিস্তৃত সরবরাহব্যবস্থা।

কিন্তু এই অর্থনীতির আরেকটি দিক হলো ফুটপাতের জায়গা ব্যবহারকে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের দাবি, ঢাকার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ফেডারেশনের হিসাবে, দৈনিক গড়ে ৩০০ টাকা করে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হকারের কাছ থেকে অর্থ আদায় হলে বছরে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। তবে এটি সংগঠনটির দেওয়া হিসাব; সরকারি নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত চাঁদার পরিমাণ নয়।

২০২৪ সালের জুনে ডয়চে ভেলে ও ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হকারদের বক্তব্যের বরাতে বলা হয়, ফুটপাতের জায়গা ব্যবহারের জন্য অনেককে দৈনিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়। জায়গার আয়তন, অবস্থান ও দোকানের ধরন অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণও আলাদা। গুলিস্তান, নিউমার্কেট, মতিঝিল, পল্টনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় এমন অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। হকারদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, লাইনম্যান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও দুই সিটি করপোরেশন অভিযোগ অস্বীকার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল।

এই চাঁদা আদায়ের হিসাব নিয়ে আগের গবেষণাতেও বিপুল অঙ্কের তথ্য উঠে এসেছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ২০১৬ সালের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে বছরে আনুমানিক ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। পরবর্তী সময়ে হকার সংগঠনগুলোর হিসাবে এই অঙ্ক আরও বেড়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ের গবেষণা, হকারের সংখ্যার পার্থক্য এবং চাঁদার গড় হার বিবেচনায় এসব হিসাবকে একই সময়ের নির্ভুল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ফুটপাত দখলের কারণে নগরবাসীর ভোগান্তিও বাড়ছে। অনেক এলাকায় দোকানের কারণে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে মূল সড়কে নামতে হয়। এতে যানবাহনের সঙ্গে পথচারীদের সংঘাত তৈরি হয়, বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজট। অন্যদিকে ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে দিলেই তাঁদের জীবিকার প্রশ্নটির সমাধান হয় না। উচ্ছেদ অভিযানের পর অনেক এলাকায় আবার দোকান বসতে দেখা যায়। ফলে জায়গা দখল, উচ্ছেদ, পুনর্দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগের চক্র চলতে থাকে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার ২০২৬ সালে ‘ঢাকা সিটি হকার পুনর্বাসন নীতিমালা’ করেছে। নীতিমালায় হকারদের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসা পরিচালনা, পরিচয়পত্র প্রদান এবং ছুটির দিন ও রাতের বাজার চালুর বিধান রাখা হয়েছে। দোকান বসানোর পর পথচারীদের চলাচলের জন্য অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ফুট জায়গা খালি রাখার নির্দেশনাও রয়েছে। নীতিমালার লক্ষ্য একদিকে ফুটপাত সচল রাখা, অন্যদিকে হকারদের ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করা। তবে জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে সব হকারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ফুটপাতের মতো সড়ককেন্দ্রিক আরেকটি বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনকে ঘিরে। গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও একই ধরনের বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহন চলাচল করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব যানবাহন দেশের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অননুমোদিত ও অনানুষ্ঠানিক চার্জিংয়ের কারণে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। বিপরীতে সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০। অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও রাজস্ব ক্ষতির হিসাবের যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া এ খাতের আর্থিক প্রভাব সম্পূর্ণভাবে নিরূপণ করা কঠিন।

এই যানবাহনগুলোকে কেন্দ্র করে চালক, মালিক, গ্যারেজ পরিচালনাকারী, মিস্ত্রি, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ বিক্রেতা এবং চার্জিং ব্যবসায়ীদের জীবিকা গড়ে উঠেছে। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য কম ভাড়ায় এসব যান ব্যবহার করেন বহু মানুষ। ফলে কেবল যানবাহন সরিয়ে দেওয়া বা চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেই পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কর্মসংস্থান, স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের ব্যয় এবং বিকল্প পরিবহনের প্রাপ্যতার প্রশ্ন। তবে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, সড়ক নিরাপত্তা, বিদ্যুতের অপচয় এবং অননুমোদিত চার্জিংয়ের সমস্যাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

দেশের শ্রমবাজারের সামগ্রিক চিত্রও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত ৭ কোটি ১৭ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। অর্থাৎ মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক। তাঁদের মধ্যে ১ কোটি ৩২ লাখ শহরাঞ্চলে এবং ৪ কোটি ৪৮ লাখ গ্রামাঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। তবে এই পরিসংখ্যানের সবাই ফুটপাতের হকার বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত নন; বরং এটি দেশের বৃহত্তর অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের চিত্র।

ফুটপাতের বাণিজ্য ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অর্থনীতিতে তাই একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে জনপরিসর দখল, চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, রাজস্ব ক্ষতি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার সংকট; অন্যদিকে বিপুল মানুষের জীবিকা ও স্বল্প আয়ের মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন। একদিকে ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার দায়িত্ব, অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া হকারদের উচ্ছেদের সামাজিক প্রভাব। একইভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, আবার এসব যান থেকে নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এই দুই খাতকে নিয়মের মধ্যে আনতে হলে প্রথম প্রয়োজন প্রকৃত সংখ্যা, দৈনিক লেনদেন, অর্থ আদায়ের ধরন, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার। ফুটপাতের জন্য নিবন্ধিত ব্যবসার জায়গা, নির্ধারিত ফি এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন, চলাচলের নির্দিষ্ট এলাকা, নিরাপদ চার্জিং পয়েন্ট এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উচ্ছেদ বা নিষেধাজ্ঞার আগে বিকল্প জীবিকা ও পরিবহনের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা জরুরি।

রাস্তা ও ফুটপাতের এই অর্থনীতি পুরোপুরি অদৃশ্য নয়; প্রতিদিন নগরবাসী এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, অর্থ আদায়ের জবাবদিহি এবং কর্মসংস্থানের স্বীকৃতি ছাড়া এর প্রকৃত আকার ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। নিয়মের বাইরে থাকা এই অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তাই শুধু উচ্ছেদ বা নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর তদারকি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ