ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনমে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গুগলের এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ ঘিরে স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, বিপুল বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির আড়ালে সামনে আসছে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার, কৃষিজমি হারানো এবং পরিবেশগত ক্ষতির প্রশ্ন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তাদের জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়বে, অথচ সেই উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না।
প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৬০০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বনভূমি ও কৃষিজমি পরিষ্কারের কাজ চলছে। স্থানীয় কৃষক চন্দলা সদাম্মার দুই একর জমি এই প্রকল্পের জন্য নেওয়া হয়েছে। জমির বিনিময়ে তিনি ৮২ হাজার ডলারের বেশি পেলেও জমি হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁর মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। তাঁর ভাষ্য, জমি নেওয়ার সময় তাঁদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিলেই কি কৃষিজমি হারানোর ক্ষতি পূরণ হয়? জমির সঙ্গে মানুষের জীবিকা, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জড়িয়ে থাকে। বড় বিনিয়োগের হিসাবের বাইরে এসব ক্ষতির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।
পানির সংকট নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। ডেটা সেন্টারে বিপুলসংখ্যক সার্ভার চালু রাখতে তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। প্রচলিত কিছু শীতলীকরণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি লাগে। গুগল জানিয়েছে, ভারতের এই প্রকল্পে পানি ব্যবহার করে শীতলীকরণের পরিবর্তে উন্নত বায়ু-শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির এই বক্তব্যের পাশাপাশি প্রকৃত পানির চাহিদা, বিকল্প উৎস এবং স্থানীয় পানিসম্পদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
বিশাখাপত্তনমের এক দোকানি গুব্বালা রামানাম্মা স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা বলে গুগলের ডেটা সেন্টার নির্মাণের যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায়, এলাকাটি আগে থেকেই পানির সংকটে ভুগছে।
এখানেই উন্নয়নের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যে এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণই উদ্বেগের বিষয়, সেখানে বৃহৎ শিল্প ও প্রযুক্তি স্থাপনার জন্য পানি ও বিদ্যুতের চাহিদা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে উন্নয়নের সাফল্য পরিমাপ করা যায় না; স্থানীয় মানুষের মৌলিক সেবা ও জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
গুগলের দাবি, প্রকল্পটি থেকে প্রতিবছর স্থানীয় অর্থনীতিতে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। নির্মাণকাজে প্রায় ৪ হাজার ২০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ২০২৮ সালে কেন্দ্রটি চালু হলে কয়েকশ বিশেষায়িত পদেও নিয়োগ দেওয়া হবে। অন্ধ্র প্রদেশ সরকারও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ লাখ ৮৮ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করছে।
কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির বিপরীতে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর কতজন স্থায়ী চাকরি পাবেন? সেই চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা স্থানীয় তরুণদের আছে কি না, থাকলে তাঁদের কতজন নিয়োগ পাবেন? কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জমি হারানো পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও জীবিকার নিশ্চয়তা কীভাবে দেওয়া হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া বিনিয়োগের সামগ্রিক সুফল নির্ধারণ কঠিন।
বিশাখাপত্তনমে শুধু গুগল নয়, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্রুকফিল্ড ও ডিজিটাল রিয়েলটির যৌথ উদ্যোগেও ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আরেকটি এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একই অঞ্চলে একাধিক বৃহৎ প্রযুক্তি স্থাপনার সম্মিলিত পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ১.২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছয়টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
পরিবেশকর্মীরা রাজ্যজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ না করা পর্যন্ত নতুন স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। স্থানীয় সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফোরামের সদস্য গুট্টা রোহিতের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে উপকূলীয় এলাকা থাকা সত্ত্বেও এসব স্থাপনা ভারতের মতো অঞ্চলে কেন গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর মতে, স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন শ্রমনির্ভর শিল্প; শুধু বিপুল পুঁজিনির্ভর স্থাপনা নয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও বিনিয়োগের বিরোধিতা করাই মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, সেই অগ্রগতির ব্যয় কে বহন করবে এবং এর সুফল কারা পাবে। কৃষিজমি হারানো মানুষ, পানির সংকটে থাকা পরিবার ও স্থানীয় পরিবেশের স্বার্থকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের হিসাব পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। তাই প্রকল্পের প্রকৃত পানি ও বিদ্যুৎ চাহিদা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থায়ী কর্মসংস্থানের পরিমাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ জরুরি। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অধিকার ও মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা থাকলেই এ ধরনের বৃহৎ বিনিয়োগের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে পারে।