কপ-৩১: জলবায়ু সুরক্ষায় এআইয়ের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩.৫ এক্সাজুল জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা, বাড়ছে ডেটা সেন্টারের নিঃসরণ নিয়ে উদ্বেগ

প্রকৃতির সংবাদ রিপোর্ট

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থাপনা, শিল্পকারখানার কার্বন নিঃসরণ শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ এক্সাজুল জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে। তবে এআই পরিচালনায় ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্মেলনের আয়োজকেরা জলবায়ু সচেতন এআই ব্যবহারের বিষয়টি এগিয়ে নিচ্ছেন। প্রযুক্তিটির পরিবেশগত প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিতর্কের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

আইইএর এআই বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ সিং বলেন, ডেটা সেন্টার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এআইয়ের কারণে জ্বালানি ব্যবস্থা ও জলবায়ুর ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে। এর প্রভাব নির্ভর করছে কীভাবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থাপনায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মেঘের আচ্ছাদন, সূর্যালোক ও বাতাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা সম্ভব হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হয়।

আইইএর হিসাব অনুযায়ী, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও ভবনসহ বিভিন্ন খাতে এআইয়ের ব্যাপক প্রয়োগ হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ এক্সাজুল জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে। জ্বালানির এ পরিমাণ ইন্দোনেশিয়ার এক বছরের মোট চাহিদার সমান। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওয়াটটাইমও এমন সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে, যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহৃত হয়।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও এআই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। ইউরোপীয় মাঝারি-মেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ইসিএমডব্লিউএফ) মহাপরিচালক ফ্লোরিয়ান পাপেনবার্গার বলেন, এআইয়ের সাহায্যে আগের তুলনায় দ্রুত ও নির্ভুলভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এ প্রযুক্তি ব্যবহারে এমন কিছু কাজ দুই বছরে করা যাচ্ছে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে করতে ১০ বছর লাগত।

গুগলের তথ্য অনুযায়ী, তাদের একটি এআইভিত্তিক ব্যবস্থা ১৫০টিরও বেশি দেশে সাত দিন আগে পর্যন্ত বন্যার পূর্বাভাস দিতে পারে। এ ধরনের প্রযুক্তি দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতিতে সহায়তা করতে পারে।

স্যাটেলাইটের সঙ্গে এআই ব্যবহার করে তেল-গ্যাস স্থাপনা, খনি ও বর্জ্য ফেলার স্থান থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণও শনাক্ত করা হচ্ছে। ক্লাইমেট ট্রেস নামের একটি উদ্যোগ এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে নিঃসরণ পর্যবেক্ষণ এবং দূষণকারী উৎসগুলোর তথ্যভান্ডার তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ম্যাককরমিকের ভাষ্য, এআইয়ের সাহায্যে বিভিন্ন শহরের নিঃসরণের তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে কাজে লাগছে।

তবে এআইয়ের ব্যবহার সব ক্ষেত্রে জলবায়ুর জন্য ইতিবাচক নয়। তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ, ভূগর্ভস্থ জ্বালানির মজুত শনাক্ত এবং জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআইয়ের ব্যবহার উৎসাহিত করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট চেঞ্জ এআইয়ের নির্বাহী পরিচালক মারিয়া জোয়াও সুজা বলেন, এ ধরনের ব্যবহার জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনায় বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন হওয়ায় ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। এ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হলে কার্বন নিঃসরণও বাড়তে পারে। ফলে জলবায়ু সুরক্ষায় এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর জ্বালানি ব্যবহার ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। কপ-৩১ সম্মেলনে প্রযুক্তিটির সুফল ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ