দাঁতের ব্যথা, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কিংবা দাঁত ক্ষয়—অনেকের কাছেই এগুলো সাধারণ সমস্যা। কিন্তু উন্নয়নশীল বাংলাদেশের বাস্তবতায় দন্তস্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; এটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ এবং স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অথচ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনের সময় দন্তচিকিৎসা নিতে পারেন না। অর্থের সংকট, চিকিৎসকের স্বল্পতা, গ্রামাঞ্চলে সেবার অপ্রতুলতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দন্তস্বাস্থ্যের দুর্বল সংযোগ এ সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দন্তস্বাস্থ্যকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার পথে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় দন্তস্বাস্থ্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০২৫–২০৩০ অনুমোদন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, এই কৌশলের লক্ষ্য হলো দন্তরোগের বোঝা কমানো, সেবার সুযোগ বাড়ানো এবং দন্তস্বাস্থ্যকর্মীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশের দন্তস্বাস্থ্যের চিত্রটি উদ্বেগজনক। ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ অন্তত একটি মুখের রোগে আক্রান্ত। ২০২০ সালে বাংলাদেশে ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসারের নতুন রোগী ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৯৮৫ জন। একই সঙ্গে একটি জরিপে ৭১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা জীবনে কখনো কোনো ধরনের দন্তচিকিৎসা নেননি।
ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশের ২০১৯ সালের হিসাবও সমস্যাটির ব্যাপ্তি বোঝায়। ১ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দুধদাঁতের চিকিৎসাহীন ক্ষয়ের হার ছিল ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের স্থায়ী দাঁতের চিকিৎসাহীন ক্ষয়ের হার ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে গুরুতর মাড়ির রোগের হার ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থাৎ শিশু থেকে প্রবীণ—জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই দন্তস্বাস্থ্য সংকট রয়েছে। অথচ এসব রোগের বড় একটি অংশ শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে দন্তস্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় সমস্যা চিকিৎসক ও সেবাকেন্দ্রের অসম বণ্টন। ডব্লিউএইচওর ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত দন্তচিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৬০৮ জন, অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে দন্তচিকিৎসক মাত্র শূন্য দশমিক ৬ জন।
এখানে শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা নয়, তাঁদের কোথায় সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ও বড় শহরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দন্তচিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও প্রত্যন্ত গ্রাম, চর, হাওর কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন।
ডব্লিউএইচও বলছে, বাংলাদেশে দন্তস্বাস্থ্যের সংকটের অন্যতম কারণ হলো গ্রামীণ এলাকায় সীমিত সেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতার ঘাটতি, দন্তস্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে দন্তস্বাস্থ্যের দুর্বল সমন্বয়।
দন্তচিকিৎসার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সক্ষমতা একটি বড় নিয়ামক। দাঁতের ক্ষয় বা মাড়ির রোগ শুরুতে চিকিৎসা করলে ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও চিকিৎসা না করিয়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে সংক্রমণ, দাঁত তুলে ফেলা, রুট ক্যানাল, কৃত্রিম দাঁত কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে দরিদ্র পরিবারের জন্য ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডব্লিউএইচওর ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, দন্তস্বাস্থ্যে মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় ছিল মাত্র ০.১ মার্কিন ডলার। একই সময়ে পাঁচ ধরনের প্রধান মুখের রোগের কারণে উৎপাদনশীলতা হারানোর আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৬৩৭ মিলিয়ন ডলার।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ডব্লিউএইচওর ওই প্রোফাইলে ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্টকেও বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের শ্রমিকের জন্য ‘অপ্রতুল সামর্থ্যের’ পণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। একজন নিম্নতম দক্ষতার সরকারি কর্মীর হিসাবে একজন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক টুথপেস্ট কিনতে ২ দশমিক ৮ দিনের শ্রমের আয় প্রয়োজন হতো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান স্পষ্ট—মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুখের রোগের কারণে ব্যথা ও অস্বস্তি যেমন হয়, তেমনি শিশুদের পড়াশোনা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কাজেও প্রভাব পড়ে। চিকিৎসাহীন দন্তরোগ পরিবারে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো মুখের রোগে আক্রান্ত। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই এই রোগের বোঝা বেশি। ডব্লিউএইচওর মতে, দরিদ্র ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের মধ্যে দন্তরোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
এ কারণেই ২০২১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ দন্তস্বাস্থ্যকে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। ডব্লিউএইচওর বৈশ্বিক কৌশলের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য দন্তস্বাস্থ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের নতুন জাতীয় দন্তস্বাস্থ্য কৌশল এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ। কর্মপরিকল্পনায় সাশ্রয়ী দন্তচিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো, প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সেবার আওতায় আনা, দন্তস্বাস্থ্যকর্মী বাড়ানো ও তাঁদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার, তথ্যভান্ডার উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৌশলটির লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে চিকিৎসাহীন দাঁতের ক্ষয়ের হার ২৫ শতাংশ কমানো এবং মুখের ক্যানসারে অকালমৃত্যু ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমাতে অবদান রাখা।
তবে পরিকল্পনা অনুমোদনই শেষ কথা নয়। বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি পর্যায়ে প্রাথমিক দন্তসেবা যুক্ত করা, বিদ্যালয়ভিত্তিক দাঁতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দরিদ্র মানুষের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহারে সচেতনতা এবং তামাক-জর্দা-সুপারির ব্যবহার কমানোর মতো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দন্তস্বাস্থ্যকে শুধু ‘দাঁতের চিকিৎসা’ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। দাঁতের রোগের বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করা, ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার, অতিরিক্ত চিনি কমানো এবং তামাক ও জর্দা পরিহার করার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। ডব্লিউএইচও দিনে দুবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দেয়।
উন্নয়নশীল দেশের সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় তাই ব্যয়বহুল চিকিৎসার চেয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধ ও সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করাই বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে দন্তস্বাস্থ্যকে আলাদা কোনো বিলাসী চিকিৎসা নয়, বরং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ হলো নতুন জাতীয় কৌশলকে বাস্তব সেবায় রূপ দেওয়া। কারণ দাঁতের চিকিৎসা পাওয়ার সামর্থ্য শুধু ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে—এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোনোভাবেই সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। একজন দরিদ্র শিশু, একজন গ্রামীণ কৃষক কিংবা একজন শহুরে নিম্নআয়ের শ্রমিক—সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট পরিচালনা করছে। রাষ্ট্রস্বীকৃত এই সনদধারীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সঠিক আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসলে তারা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় বড় অবদান রাখতে পারে। সবার জন্য প্রয়োজনের সময়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী দন্তচিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে স্বাস্থ্য অধিকারের প্রকৃত বাস্তবায়ন।