কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ভালো দামের প্রভাবে রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা ছোটো জমিতে এই সবজি চাষ শুরু করেছেন এবং ভালো ফলন ও লাভজনক দামের কারণে প্রতিবেশীদেরও উৎসাহিত করছেন। কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের কৃষক কবির মিয়া ও আব্দুর রহিম প্রতিবেশীদের জমিতে রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ দেখে নিজেদের জমিতেও চাষের সিদ্ধান্ত নেন। উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় কবির মিয়া ১০ শতাংশ জমিতে রঙিন ফুলকপি চাষ করেছেন। আব্দুর রহিম তার ছেলে বোরহানকে সঙ্গে নিয়ে ৮ শতাংশ জমিতে ক্রাউন জাতের ব্রকলি চাষ করছেন। তাদের জমিতে ফলনের মান এবং বাজারদর ভালো হওয়ায় এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ময়মনসিংহ অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি প্রায় ৪৫ শতাংশ জমিতে আবাদ করা হয়েছে। কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, দুই মাসের মধ্যেই ফসল বিক্রির উপযোগী হয়েছে এবং তারা ইতিমধ্যেই বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন। কম সময়ে কম খরচে ফলন বেশি হওয়ায় চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কালিকাপ্রসাদ গ্রামের কৃষক কবির মিয়া বলেন, “গত বছর আমার চাচাতো ভাই রঙিন ফুলকপি চাষ করে ভালো লাভবান হয়েছেন। তার জমিতে দেখেই আমি ১০ শতাংশ জমিতে ১৯০০ রঙিন ফুলকপির চারা আবাদ করেছি। জমিতে ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারে প্রতি পিস পাইকারি দরে ৪০–৪৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আশা করছি এবারও লাভবান হব।”
আব্দুর রহিম বলেন, “উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় আমরা ব্রকলি চাষ করেছি। কম সময়ে কম খরচে বেশি ফলন হওয়ার কারণে আশা করছি ভালো লাভ। আমার ছেলে বোরহানও চাষের সব প্রক্রিয়ায় আমাকে সহায়তা করছে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আকলিমা বেগম জানান, “রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। বাজারদর ভালো হওয়ায় কৃষকরা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কৃষি অফিসের সহযোগিতায় এই বছর মোট ৪৫ শতাংশ জমিতে চাষ হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামীতে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের কৃষকরাও চাষ শুরু করবেন।”
চাষের পদ্ধতিও সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালিত হচ্ছে। রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলির চারা আগাম উৎপাদিত ও সুস্থ হওয়া প্রয়োজন। এজন্য কৃষকরা বীজ নির্বাচনের পর মাটি যাচাই, সার প্রয়োগ এবং জল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুসরণ করছেন। ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে স্থানীয় কৃষকরা নিয়মিত তত্ত্বাবধানে থাকছেন এবং প্রয়োজনে চারা রোপণের সময় ও পরিচর্যায় নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় বাজারে এই সবজি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পাইকারি দরে প্রতি পিস রঙিন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৪০–৪৫ টাকা এবং ব্রকলি প্রতি কেজি ৬০–৭০ টাকার মধ্যে। স্থানীয় সবজি পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে এসব কিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। কৃষকরা আশা করছেন, এই বাজার চাহিদা এবং মূল্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ কৃষকের আয়ের পাশাপাশি পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে কেবল আয় নয়, বরং এলাকার শিশু ও পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ সবজি সরবরাহের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কৃষি অফিসের সহায়তায় নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের সবজি চাষের ফলে কৃষকেরা কম সময়ে বেশি ফলন নিতে সক্ষম হচ্ছেন। কৃষকরা জানিয়েছেন, চাহিদা থাকায় ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে রঙিন ফুলকপি ও ব্রকলি চাষ করার পরিকল্পনা করছেন। উপজেলা কৃষি অফিসও কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সঠিক চাষাবাদ প্রযুক্তি এবং বাজার সংযোগের মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখছে। ভৈরবের এই উদ্যোগ ন্যূনতম খরচে দ্রুত লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। কৃষি অফিস আশা করছে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রণোদনার মাধ্যমে আরও কৃষক এই লাভজনক সবজি চাষে উৎসাহিত হবেন। এতে কেবল কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে না, বরং স্থানীয় বাজারে স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ সবজি সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে।