সিলেট সংবাদদাতা
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত নান্দনিক লাল শাপলা বিল এখন পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এই বিলটিতে কচুরিপানার লাগামহীন বিস্তারে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও নৈসর্গিক রূপ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশ সংগঠক ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই এই অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হারাবে।
এ অবস্থায় পরিবেশ সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’–এর উদ্যোগে একটি প্রতিনিধি দল গত ২৪ জানুয়ারি শনিবার সকালে লাল শাপলা বিল পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল সংবাদপত্রে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যেভাবে কচুরিপানা শাপলা বিল জুড়ে বিস্তার লাভ করছে, তাতে খুব শিগগিরই লাল শাপলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। একই সঙ্গে বিলের পানির স্বচ্ছতা, জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা জানান, কচুরিপানা পানির ওপর ঘন স্তর তৈরি করে সূর্যালোক ও অক্সিজেন প্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
পরিবেশবিদরা ডিবির হাওর এলাকায় রাস্তার পাশে রোপণ করা কিছু গাছ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন। তাদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণের নামে অপরিকল্পিতভাবে বিদেশি বা অনুপযোগী প্রজাতির গাছ লাগালে দীর্ঘমেয়াদে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
শাপলা বিলের প্রাণ–প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে কচুরিপানাসহ অন্যান্য আগ্রাসী উদ্ভিদের বিস্তার রোধে নিয়মিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান পরিদর্শক দল। পাশাপাশি তারা বলেন, বিলের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় হিজল, করচ, তাল, সুপারি ছাড়াও দেশীয় প্রজাতির বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম ডিবির হাওরের এই অংশে শীত মৌসুমে লাল শাপলার অস্তিত্ব লক্ষ্য করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের দিকে লাল শাপলা বিল স্থানীয় পর্যটকদের নজর কাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে এর পরিচিতি বাড়তে থাকে। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ভোরের আলোয় ফোটা লাল শাপলা দেখতে ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। সূর্যোদয় থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত এ এলাকায় পর্যটকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি থাকে, বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারে।
তবে জনপ্রিয়তা বাড়লেও শাপলা বিলকে ঘিরে এখনো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি বলে মনে করেন পরিবেশকর্মীরা। তাদের মতে, অপরিকল্পিত পর্যটন, ময়লা-আবর্জনা এবং কচুরিপানার আগ্রাসন একসঙ্গে মিলেই শাপলা বিলের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
পরিদর্শক দল শাপলা বিল ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা এবং স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তারা পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন, যাতে এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত রাখা যায়।