মহাখালী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও গাবতলীতে সড়ক দখল করে যাত্রী ওঠানামা; প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থা টার্মিনাল আছে, তবু সড়কে বাস কাউন্টার,যানজট কমাতে প্রয়োজন নতুন ব্যবস্থাপনা
রাজধানী ঢাকার যানজটের পেছনে নানা কারণ থাকলেও আন্তজেলা বাসের যত্রতত্র কাউন্টার, সড়কের ওপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা এবং টার্মিনালকে বাসের ডিপো হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও গুলিস্তানসহ নগরের বিভিন্ন প্রধান সড়কের পাশে থাকা বাস কাউন্টারগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে যানবাহনের চাপ। কোথাও কাউন্টারের সামনে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, কোথাও টিকিট বিক্রির জন্য বাস দীর্ঘ সময় সড়কে অপেক্ষা করছে। এতে সড়কের কার্যকর প্রশস্ততা কমে গিয়ে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে টার্মিনালের বাইরে ৪৪২টি অবৈধ বা অনুমোদনহীন বাস কাউন্টার চিহ্নিত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বিপরীতে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ এই তিন টার্মিনালের ভেতরে কাউন্টার রয়েছে মোট ৩২৫টি। এসব টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি বাস পরিচালিত হয়।
সমস্যার বড় অংশ তৈরি হচ্ছে টার্মিনালের বাইরে থাকা কাউন্টারগুলোকে ঘিরে। সায়েদাবাদ এলাকায় টিটিপাড়া থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত ২৪০টি অনুমোদনহীন কাউন্টার চিহ্নিত করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এসব কাউন্টারের সামনে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং টিকিট বিক্রির কারণে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে চলতি বছর সেখানে উচ্ছেদ অভিযানও চালানো হয়েছে।
ডিএমপিও রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালের বাইরে থাকা আন্তজেলা বাস কাউন্টার সরানোর নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সড়কের পাশে বাস দাঁড় করানো ও যাত্রী ওঠানামা যানজটের অন্যতম কারণ।
মহাখালী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশপথ। এখানে আন্তজেলা বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার গণপরিবহনও চলাচল করে। টার্মিনালের সামনে বাস দাঁড়িয়ে থাকা, ইউটার্নে বাসের চাপ এবং সড়কের পাশে বাস রাখার কারণে যানজট তৈরি হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মহাখালীর ক্ষেত্রে শুধু কাউন্টার সরালেই সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। টার্মিনালের ভেতরে বাসের প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়সূচি, বাস রাখার জায়গা এবং যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাপনাও পুনর্গঠন করতে হবে।
গাবতলী দিয়ে দেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক বাস চলাচল করে। ফলে এখানে আন্তজেলা বাসের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কিন্তু টার্মিনালের জায়গার একটি অংশ যদি অচল বাস, মেরামত ও ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে যাত্রী ও চলন্ত বাসের জন্য কার্যকর জায়গা কমে যায়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে গাবতলী ও অন্যান্য টার্মিনালের ভেতরে অচল বাস রাখার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
গুলিস্তান রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন কেন্দ্র। এখানে আন্তজেলা বাসের পাশাপাশি নগর পরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, পথচারী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। ফলে একই জায়গায় বিভিন্ন ধরনের পরিবহনের চাপ তৈরি হয়।
২০২৬ সালের জুনে ঢাকার চারটি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান, গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী হেমায়েতপুরে, মহাখালী পূর্ব দিকে অস্থায়ীভাবে এবং পরে টঙ্গীর কাছে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে নেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টারগুলো নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কাউন্টার, টার্মিনাল, বাসের ডিপো এবং যাত্রী ওঠানামা এই চারটি বিষয়কে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
প্রথমত, ঢাকার প্রধান সড়কের পাশে আন্তজেলা বাসের কোনো কাউন্টার রাখা উচিত নয়। প্রতিটি পরিবহন কোম্পানির জন্য টার্মিনালের ভেতরে নির্দিষ্ট কাউন্টার বরাদ্দ দিতে হবে। টার্মিনালের জায়গা না থাকলে নতুন করে কাউন্টার তৈরির পরিবর্তে আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাসের যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট বে বা প্ল্যাটফর্ম করতে হবে। কাউন্টারের সামনে সড়কে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয়ত, টার্মিনালকে ডিপো হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অচল ও মেরামতের প্রয়োজন এমন বাস শহরের বাইরে নির্ধারিত ডিপোতে রাখতে হবে। এতে টার্মিনালের জায়গা যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
চতুর্থত, শহরের প্রবেশমুখে পরিকল্পিত পরিবহন হাব তৈরি করা যেতে পারে। দূরপাল্লার বাস সেখানে এসে যাত্রী নামাবে বা তুলবে। এরপর যাত্রীরা নগর বাস, মেট্রোরেল বা অন্যান্য গণপরিবহনের মাধ্যমে ঢাকার ভেতরে যাতায়াত করতে পারবেন।
পঞ্চমত, অনলাইনে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। বর্তমানে অনেক কাউন্টারের প্রয়োজন তৈরি হয় মূলত যাত্রীদের সরাসরি টিকিট কেনার সুবিধার জন্য। অনলাইন ও মোবাইলভিত্তিক টিকিটিং সহজলভ্য হলে রাস্তার পাশে অসংখ্য কাউন্টার রাখার প্রয়োজন কমবে।
ষষ্ঠত, কাউন্টার উচ্ছেদের পাশাপাশি সড়কে বাস দাঁড় করানোর বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। অভিযান শুধু বিশেষ দিবস বা ঈদের আগে হলে হবে না। নির্দিষ্ট সড়কে কোন পরিবহন কতক্ষণ দাঁড়াতে পারবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে এসব বিষয়ে স্থায়ী নিয়ম করতে হবে।
বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেও যাত্রীদের ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য কার্যকর সংযোগব্যবস্থা না থাকলে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের আলোচনাতেও টার্মিনাল সরানোর পাশাপাশি বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর কার্যকর ব্যবহার এবং শহরতলিতে বাসের ডিপো সরানোর প্রয়োজনীয়তার কথা এসেছে।
তাই ঢাকার যানজট কমাতে শুধু ‘কাউন্টার উচ্ছেদ’ নয়, প্রয়োজন ‘কাউন্টার ব্যবস্থাপনা’। মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও গুলিস্তান এলাকায় রাস্তার ওপর বাস দাঁড়ানো বন্ধ , সব আন্তজেলা কাউন্টার নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া, টার্মিনাল থেকে ডিপো সরানো, নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছাড়ার ব্যবস্থা এবং শহরের বাইরে আধুনিক পরিবহন হাব গড়ে তোলা এই সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
কারণ রাস্তা প্রশস্ত করলেই যানজট কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই। রাস্তার জায়গা দখল করে থাকা বাস ও কাউন্টারকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনাই এখন ঢাকার যানজট নিরসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।