বালোচিস্তানের স্বাধীনতার লড়াইকে ঘুরপথে সমর্থন জানানোর অভিযোগ উঠল ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে। দক্ষিণ পশ্চিম প্রদেশটি পাকিস্তানের থেকে পৃথক হলে কী কী সুবিধা হবে ইহুদিদের? লাভের গুড়ে কতটা ভাগ পাবে ভারত?
পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা পেতে মরিয়া বালোচিস্তান। ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়েছে সেখানকার গণবিক্ষোভ। শুধু তা-ই নয়, রাওয়ালপিন্ডির ফৌজের সঙ্গে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ‘যুদ্ধ’ চলছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ-হেন পরিস্থিতিতে পর্দার আড়াল থেকে বিদ্রোহীদের মদত দিচ্ছে ইজ়রায়েল? আতঙ্কগ্রস্ত ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীতে এই নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।


চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযানে নামলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, লড়াই শুরুর ঠিক এক দিন আগে (পড়ুন ২৭ ফেব্রুয়ারি) দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক অন্যতম থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা মেমরি। এর পোশাকি নাম ‘বালোচিস্তান স্টাডিজ় প্রজেক্ট’।


গত ১২ জুন থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশটিকে নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে প্রবন্ধ, ছবি, গবেষণা এবং সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করছে মেমরি। সেগুলির অধিকাংশতেই পশ্চিমি দুনিয়ার ‘স্বাভাবিক বন্ধু’ হিসাবে বালোচিস্তানকে তুলে ধরা হচ্ছে। সন্দেহের এখানেই শেষ নয়। মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন কর্নেল ইগাল কারমন, কর্মজীবনের প্রথম ২০ বছর যিনি কাটিয়েছেন ইজ়রায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদে।


এ-হেন মেমরির বিরুদ্ধে ২০১২ সাল থেকে ইহুদি রাষ্ট্রে গোয়েন্দা তথ্য পাচারের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সেই লক্ষ্যেই ১৯৯৮ সালে ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কের দফতর খোলেন সুচতুর ইজ়রায়েলি কর্নেল। বর্তমানে তাঁর ওয়েবসাইটের বালোচিস্তান সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি অনুবাদ ও প্রকাশ করছে আরবি, ফারসি ও তুর্কিভাষী একাধিক গণমাধ্যম। পাশাপাশি, ভাইরাল হচ্ছে স্ক্রিনশটও।


দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম বড় মুখ হলেন মির ইয়ার বালোচ। এ বছরের মে মাসে এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বালোচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তিনি। ২০২৫ সালে জঙ্গি দমনে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে ভারত। এর সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’। একে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশীর সংঘাত চলাকালীন খোলাখুলি ভাবে দিল্লিকে সমর্থন জানান মির ইয়ার বালোচ।


মেমরি আবার এই বালোচ জাতীয়তাবাদী ও মানবাধিকার কর্মীকে ‘বিশেষ উপদেষ্টা’ হিসাবে নিয়োগ করেছে। মির ইয়ারকে কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘অন্ধ ভক্ত’ বলে মনে করে থাকেন। পাক সেনার যাবতীয় কুকীর্তি ফাঁসে সমাজমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে দেখা যায় তাঁকে। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে বালোচিস্তানে শান্তি বাহিনী পাঠানোর আর্জি জানিয়ে ইসলামাবাদের চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি।


এ বছরের জানুয়ারিতে ‘বালোচিস্তান: কৌশলগত অন্ধবিন্দু’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ ‘দ্য টাইমস অফ ইজ়রায়েলে’ প্রকাশিত হতেই আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয় হইচই। সেখানে পাকিস্তানের ওই প্রদেশটি নিয়ে তেল আভিভের মাথাব্যথার একাধিক কারণ তুলে ধরেন ইহুদি ফৌজের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার হোসে লেভ আলভারেজ গোমেজ়। পাশাপাশি, বালোচিস্তানের স্বাধীনতার যুদ্ধকে সমর্থনের কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।


ইজ়রায়েলের নিরিখে তিনটি কারণে বালোচিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশটির কৌশলগত অবস্থান। এর সঙ্গে ইহুদিদের শত্রু রাষ্ট্র ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার লম্বা সীমান্ত রয়েছে। তা ছাড়া এলাকাটিকে আরব সাগরের ‘প্রবেশদ্বার’ বলা যেতে পারে। গোমেজ় তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘বালোচেরা স্বাধীনতা পেলে কোয়েটায় দূতাবাস খোলার সুযোগ পাব আমরা। তখন তেহরান ও ইসলামাবাদ, দু’জায়গাদের নজরদারি অনেক সহজ হবে।’’

ইরানের মতো ধর্মীয় কারণে ইজ়রায়েলকে কখনও মান্যতা দেয়নি পাকিস্তান। উল্টে বহু বার প্রকাশ্যে ইহুদিদের উপর পরমাণু হামলার কথা বলতে শোনা গিয়েছে সেখানকার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা-নেত্রীদের। তাই গোড়া থেকেই ইসলামাবাদকে সন্দেহের চোখে দেখে আসছে তেল আভিভ। রাওয়ালপিন্ডির আণবিক অস্ত্র যে কোনও মুহূর্তে জঙ্গিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়নি মোসাদ।
গত শতাব্দীর ৮০-র দশক থেকে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) প্রত্যক্ষ মদতে জন্ম হয় একাধিক কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর। এর মধ্যে লশকর-এ-ত্যায়বা, জইশ-ই-মহম্মদ ও হিজবুল মুজাহিদিন উল্লেখযোগ্য। এদের সঙ্গে আবার ইরান সমর্থিত পশ্চিম এশিয়ার একাধিক বিদ্রোহী সংগঠনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। সেই তালিকায় নাম আছে গাজ়ার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা ও ইয়েমেনের হুথির।


তা ছাড়া তেহরানের আধা সেনা ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বহু কমান্ডারের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক রয়েছে একাধিক পাক ফৌজি জেনারেলের। ফলে প্রয়োজন হলেই গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে থাকেন তাঁরা। ইহুদি-বিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার মতো মারাত্মক অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। বালোচিস্তানের মাটি ব্যবহার করে এই অশুভ আঁতাঁত ভাঙতে চায় ইজ়রায়েলি গুপ্তচর সংস্থা।


দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশটি খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ। সেখানকার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম, তামা, কয়লা এবং বিরল ধাতুর (রেয়ার আর্থ মিনারেল্স) বিপুল ভান্ডার। বালোচিস্তান স্বাধীনতা পেলে এগুলিতে লগ্নির রাস্তা খুলবে ইজ়রায়েলের। এর উপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে পারে তেল আভিভের। তা ছাড়া এতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ পাবে ইহুদিরা।


বালোচিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর হল গ্বদর। এর পরিকাঠামোগত নির্মাণকাজ চালাচ্ছে চিন। এলাকাটি থেকে ইরানের চাবাহার বন্দরের দূরত্ব মেরেকেটে ১৭০ কিলোমিটার। স্বাধীনতা পেতে গ্বদর থেকে বেজিংকে তাড়াতে বর্তমানে উঠেপড়ে লেগেছে দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের প্রায় সমস্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠী। লাগাতার ড্রাগনের শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের উপর হামলা চালাচ্ছে তারা। এতে উদ্বিগ্ন ইসলামাবাদ।


গোমেজ় মনে করেন, গ্বদর থেকে চিন সরে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করতে পারে ইজ়রায়েল। এতে ভারত-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা অনেক বেশি সহজ হবে। অন্য দিকে, ইহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বালোচিস্তানেরও একাধিক স্বার্থ রয়েছে। পাক ফৌজের থেকে সম্পূর্ণ প্রদেশ ছিনিয়ে নিতে চাই অত্যাধুনিক হাতিয়ার। তাদের সেই চাহিদা পূরণ করতে পারে তেল আভিভ।


তা ছাড়া গত কয়েক বছর ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে বালোচিস্তান। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা মির ইয়ার বালোচের পোস্ট অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশের একাধিক এলাকায় নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছেন জাতীয়তাবাদীরা। কিন্তু, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন আইনের কারণে সরাসরি কোনও রাষ্ট্র সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। ইজ়রায়েলকে সামনে রেখে সেটা আদায়ের ছক কষছেন তাঁরা।


গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধে নেমে খুব দ্রুত ইরানকে হারানো যাবে বলে একরকম নিশ্চিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও বাস্তবে সেটা হয়নি। উল্টে তেহরানের শর্ত মেনে সংঘর্ষবিরতিতে যেতে বাধ্য হতে পারে ওয়াশিংটন। আগামী দিনে এই লড়াই নতুন করে শুরু হলে বালোচিস্তান হাতে থাকা খুবই জরুরি। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিম পাক প্রদেশ দিয়ে পিছন থেকে হামলা চালানোর সুযোগ পাবে আমেরিকা।


ফলে বালোচিস্তান নিয়ে ইজ়রায়েলি চাপ বাড়লে একে পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রদেশটি পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশের বেশি জমি নিয়ে গঠিত। অথচ সেখানকার জনসংখ্যা বেশ কম। ফলে সহজে মুঠো আলগা করবে না ইসলামাবাদ। উল্টে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে নিকেশ করতে সামরিক অভিযানের তীব্রতা বাড়াতে পারে রাওয়ালপিন্ডি।


বিশেষজ্ঞদের দাবি, বালোচিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হল ভারত। নয়াদিল্লির সমর্থন ছাড়া ইজ়রায়েলের পক্ষে সেখানকার বিদ্রোহীদের সাহায্য করা বেশ কঠিন। ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা রয়েছে মোদীর। তা ছাড়া পাক ফৌজের অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে বরাবরই সুর চড়িয়ে এসেছে বিদেশ মন্ত্রক। এ বার তার থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল্লি কিছু করে কি না, তার উত্তর দেবে সময়।