২৮ বছরের পথচলা, ৩১ হাজার মাইলের বিস্ময়: অবশেষে মায়ের বুকে ফিরলেন কার্ল বুশবি

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

শফিকুল আলম সেলিম

পৃথিবীর পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ কত দূর যেতে পারে? কতটা পথ পাড়ি দিলে একটি স্বপ্ন পূরণ হয়? আর একটি মানুষ কত বছর অপেক্ষা করতে পারেন তাঁর সন্তানের ফিরে আসার আশায়? এসব প্রশ্নের উত্তর যেন একসঙ্গে লিখে দিলেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। পৃথিবীকে পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ করার এক অবিশ্বাস্য অভিযানে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের ২৮টি বছর। পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি, দুর্গম জঙ্গল, বরফে ঢাকা সমুদ্রপথ, যুদ্ধের ভয়াবহতা, কারাগারের অন্ধকার আর অসংখ্য প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে ফিরে এসেছেন নিজের বাড়িতে। কিন্তু তাঁর এই দীর্ঘ অভিযানের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো পদক নয়, কোনো বিশ্বরেকর্ড নয়, এমনকি পৃথিবী প্রদক্ষিণের গৌরবও নয়। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো দীর্ঘ ২৮ বছর পর মায়ের বুকে ফিরে আসা।

সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর কিংস্টন আপন হালের একটি বাড়ির সামনে যখন ৫৭ বছর বয়সী কার্ল বুশবি এসে দাঁড়ালেন, তখন সেখানে তৈরি হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় আবেগঘন দৃশ্য। বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর মা এঞ্জেলা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ছেলেকে সামনে পেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের মুখে ছিল কান্না, চোখে ছিল বিস্ময় আর কণ্ঠে ছিল এক বুক জমে থাকা অভিমান। মায়ের সেই প্রশ্ন ‘এত দিন কোথায় ছিলে?’ যেন পৃথিবীর সব অভিযানের চেয়েও বড় হয়ে উঠল। ২৮ বছরের পথচলা, হাজারো বিপদ আর অসংখ্য দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষটির কাছে সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সব অর্জন যেন ম্লান হয়ে গেল।

কার্ল বুশবি যখন বাড়ি ছেড়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৯ বছর। ১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর দক্ষিণ আমেরিকার চিলির পুন্তা আরেনাস থেকে শুরু করেছিলেন তাঁর বিশ্বভ্রমণ। লক্ষ্য ছিল পায়ে হেঁটে পৃথিবী ঘুরে আবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসা। সেই সময় হয়তো তিনি নিজেও কল্পনা করতে পারেননি, এই যাত্রা শেষ করতে জীবনের প্রায় তিন দশক লেগে যাবে। তাঁর পরিকল্পনা ছিল কয়েক বছরের মধ্যে অভিযান শেষ করার। পরে হিসাব করে ধারণা করেছিলেন, হয়তো ১২ বছর লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা তাঁর সব হিসাব পাল্টে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২৮ বছর পর পূর্ণ হলো সেই স্বপ্ন।

এই অভিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল তাঁর নিজের তৈরি করা দুটি কঠিন শর্ত। প্রথমত, কোনো যানবাহন ব্যবহার করে যাত্রাপথ অতিক্রম করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী প্রদক্ষিণ শেষ না করে নিজের দেশে ফিরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ বিমান, জাহাজ কিংবা মোটরযান ব্যবহার করে কোনো পথ এগিয়ে যাওয়া তাঁর কাছে ছিল নিয়ম ভঙ্গের শামিল। নিজের জিনিসপত্র বহনের জন্য একটি ছোট দুই চাকার গাড়ি সঙ্গে নিয়ে তিনি হেঁটেছেন হাজার হাজার মাইল। কোথাও পায়ে হেঁটে, কোথাও বরফের ওপর দিয়ে, আবার কোথাও সাঁতরে পাড়ি দিয়েছেন ভয়ংকর জলরাশি।

চিলি থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় তিনি চারটি মহাদেশের ৩০টি দেশ অতিক্রম করেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩১ হাজার মাইল বা ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর এই অভিযানের নাম ছিল ‘গলিয়াথ এক্সপেডিশন’। নামের মতোই ছিল এর ব্যাপ্তি, আর তার চেয়েও বড় ছিল সাহসের পরীক্ষা।

তবে এই পথ মোটেও ফুল বিছানো ছিল না। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার মধ্যবর্তী বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপের দুর্গম জঙ্গল তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই অঞ্চল ঘন বন, পাহাড়, জলাভূমি ও দুর্গম পথের জন্য পরিচিত। সেখানে সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি ছিল। ২০০১ সালে সেই বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন তিনি। পানামায় একটি সীমান্ত এলাকায় প্রবেশের অভিযোগে তাঁকে ১৮ দিন কারাগারেও থাকতে হয়েছিল।

এরপর আসে তাঁর জীবনের অন্যতম ভয়ংকর অধ্যায় বেরিং প্রণালি অতিক্রম। আলাস্কা ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী এই বরফাচ্ছন্ন জলপথ পাড়ি দেওয়া ছিল এক দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ। ২০০৬ সালে মার্কিন অভিযাত্রী দিমিত্রি কিফারের সঙ্গে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ বরফাচ্ছন্ন পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। বরফের স্তর কখনো ভেঙে যাচ্ছে, কখনো ভেসে যাচ্ছে, আবার কোথাও জমাট বরফের ওপর দিয়ে এগোতে হচ্ছে। একপর্যায়ে মেরুভালুকের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল তাঁদের। হিমশীতল পানিতে পড়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তাঁরা। তাঁদের বহন করা সরঞ্জামও প্রায় সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে সেই ভয়ংকর পথ অতিক্রম করলেও রাশিয়ায় অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়।

রাশিয়ায় প্রবেশের পরও শেষ হয়নি বিপদ। ভিসা জটিলতা ও আবহাওয়ার কারণে বছরের পর বছর আটকে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ২০১২ সালে রাশিয়া তাঁর ভিসা প্রত্যাখ্যান করলে প্রতিবাদ জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটনে রুশ দূতাবাস পর্যন্ত হেঁটে যান। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার পথ তৈরি হয়। এভাবেই কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, কখনো অর্থসংকট, কখনো প্রতিকূল আবহাওয়া তাঁর যাত্রাকে দীর্ঘ করেছে। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার অর্থসংস্থানেও প্রভাব ফেলেছিল। পরে করোনা মহামারিও তাঁর অভিযান থামিয়ে দেয়।

কিন্তু একজন মানুষ কতটা জেদি হলে এমন পরিস্থিতিতেও নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেন, বুশবি তার অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ পথচলায় পৃথিবীর নানা প্রান্তে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন সহযোগিতা। কেউ দিয়েছেন খাবার, কেউ আশ্রয়, কেউ দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সহায়তা। তাই দেশে ফিরে তিনি বলেছেন, এই যাত্রা তিনি একা শেষ করেননি; তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে পুরো পৃথিবীই যেন সহযোগিতা করেছে। তাঁর ভাষায়, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের মানবিকতাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।

তবে এই দীর্ঘ অভিযানের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে দেখা না হওয়া। দীর্ঘ এক দশক মায়ের সঙ্গে তাঁর সরাসরি দেখা হয়নি। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ ও দেখা-সাক্ষাৎ ছিল সীমিত। তাঁর ছেলে অ্যাডামের সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলেও পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে তিনি ছিলেন বহু দূরে। এমনকি দেশে ফিরে ১২ বছর বয়সী নাতনির সঙ্গেও প্রথমবার দেখা হওয়ার কথা ছিল তাঁর। অর্থাৎ পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর এই অভিযানে তিনি শুধু পথই পাড়ি দেননি, হারিয়েছেন পরিবারের সঙ্গে কাটানোর অসংখ্য মূল্যবান মুহূর্ত।

২ নভেম্বর হালের সিটি হল এলাকায় তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিলেন শত শত মানুষ। উচ্ছ্বাস, করতালি আর শুভেচ্ছায় মুখর হয়ে উঠেছিল চারপাশ। এরপর মায়ের বাড়ির দিকে শেষ কয়েক মাইলের পথ পাড়ি দিতে থাকেন তিনি। এই শেষ পথটুকু ছিল অন্য সব পথের চেয়ে আলাদা। কারণ এবার সামনে কোনো অজানা দেশ, নতুন কোনো সীমান্ত কিংবা দুর্গম পর্বত ছিল না। সামনে ছিল তাঁর শৈশবের বাড়ি, পরিচিত শহর আর অপেক্ষায় থাকা মা।

২৮ বছর আগে যে মানুষটি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তরুণ। ফিরে এলেন বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়া, চুলে ধূসর ছাপ নিয়ে। মাঝখানের সময়টুকুতে বদলে গেছে পৃথিবী, বদলে গেছে প্রযুক্তি, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু মায়ের সন্তানের জন্য অপেক্ষা করার অনুভূতিটি বদলায়নি। বাড়ির সামনে ‘ওয়েলকাম হোম সন’ লেখা ব্যানার যেন দীর্ঘ অপেক্ষার একটি নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

কার্ল বুশবির এই প্রত্যাবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ পথও কখনো কখনো শেষ হয় একটি ছোট্ট বাড়ির দরজায়। মানুষ পাহাড় জয় করতে পারে, সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে, পৃথিবীর মানচিত্রে নিজের পদচিহ্ন রেখে আসতে পারে; কিন্তু মায়ের বুকের উষ্ণতার বিকল্প কিছুই হতে পারে না।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ সাফল্যের পেছনে ছুটছে। কেউ অর্থের জন্য, কেউ খ্যাতির জন্য, কেউ ক্ষমতার জন্য। সেই ছুটে চলার মধ্যে পরিবার, মা-বাবা, শৈশব আর আপনজনদের জন্য সময় যেন ক্রমেই কমে আসছে। অথচ কার্ল বুশবির ২৮ বছরের অভিযান আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে গেল যে পৃথিবীকে জয় করতে এতটা পথ হাঁটলাম, সেই পৃথিবীতে আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকা মানুষগুলোর কাছে ফিরে আসার আনন্দের চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে?

পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে কার্ল বুশবি হয়তো ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ইতিহাসটি লেখা হয়েছে মায়ের বাড়ির সামনে, সেই একটি আলিঙ্গনে। সেখানে কোনো পদক ছিল না, কোনো বিশ্বরেকর্ডের হিসাব ছিল না, ছিল শুধু মা ও সন্তানের ভালোবাসা।

২৮ বছরের অপেক্ষার পর মায়ের প্রশ্নের উত্তর হয়তো কথায় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তাঁর চোখের জল, মায়ের বুকে মাথা রাখা আর শক্ত করে জড়িয়ে ধরা সবকিছুই বলে দিয়েছে, তিনি কোথায় ছিলেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীর পথে, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা ছিল সেই মায়ের কাছেই। পৃথিবী ঘুরে ঘরে ফেরা যায়, কিন্তু মায়ের কাছে ফেরার আনন্দের সঙ্গে কোনো অভিযানের তুলনা হয় না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ