মূল্যস্ফীতির চাপে সংসার চালানো কঠিন, কমছে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা
প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময়
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
শেয়ার করুন
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় গত কয়েক মাস ধরে চাপে রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচ সামলাতে হচ্ছে তাদের। আয় বাড়লেও তা পণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় সংসারের বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও মে মাসের ৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ব্যয় হয়। ফলে বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তাদের হাতে অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য অর্থ কমে যায়।
বিবিএসের এক তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে টানা ৫৩ মাস দেশের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম ছিল। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজার খরচ কমাতে অনেকে আগের তুলনায় কম পরিমাণে মাছ-মাংস কিনছেন। কেউ কেউ ডিম, সবজি বা কম দামের খাদ্যপণ্যের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। পরিবারের শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনার ক্ষেত্রেও অনেককে হিসাব করে চলতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে খাদ্যপণ্যের দাম। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উঠেছিল। পরে জুনে তা কিছুটা কমলেও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে ছিল। অর্থাৎ বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে খাদ্য ব্যয়ের চাপ এখনো যথেষ্ট বেশি।
এদিকে খাদ্যপণ্যের উৎপাদক ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর।
নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যে পরিমাণ বাজার করতেন, এখন একই অর্থে তার চেয়ে কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। মাসের শুরুতেই প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পর মাসের শেষ দিকে অনেক পরিবারকে ধার করতে হচ্ছে।
দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সমস্যা আরও বেশি। কোনো দিন কাজ না থাকলে আয় বন্ধ থাকে, কিন্তু খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ বন্ধ থাকে না। ফলে বাজারদর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তাও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চাপ বোঝার ক্ষেত্রে শুধু সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার দেখলে হবে না। মানুষের আয় কতটা বেড়েছে এবং সেই আয়ের বিপরীতে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
নিম্ন আয়ের মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও খোলাবাজারে খাদ্যপণ্য বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫৫ লাখ মানুষ ছয় মাস ধরে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল পাচ্ছেন। পাশাপাশি ৪১৯টি উপজেলায় ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যেখানে ভর্তুকি মূল্যে চাল বিক্রি হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শুধু ভর্তুকি বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা ও কারসাজি বন্ধ করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর পাশাপাশি মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে মূল্যস্ফীতির ওঠানামা কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল না হওয়া এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না ফেরায় তাদের উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।