রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন—এআই দৌড়ে পক্ষ বেছে নিতে বলছে ওয়াশিংটন

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বেশ কিছু দেশকে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অভ্যন্তরীণ খসড়া চিঠি ও এক মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। খসড়ায় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তারা যদি বেইজিংয়ের নেতৃত্বাধীন এআই উদ্যোগে যোগ দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বাদ পড়তে পারে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে গত বছর ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে ওয়াশিংটন। এর লক্ষ্য ছিল এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করা।

কাজাখস্তানসহ প্রায় ২৪টি দেশ এই উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। কাজাখস্তান গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের বড় উৎস। দেশটি একই সঙ্গে চীনের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগেও যোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও প্যাক্স সিলিকার সদস্য। এআই মডেল, চিপ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে ‘এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্টে’ সই করা ৩৫টি দেশের কাছে চিঠিটি পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি খসড়া চিঠিটি গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্ট নামের একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করা ৩৫টি দেশের উদ্দেশে লেখা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে প্যাক্স সিলিকার সদস্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআই নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী দেশগুলো রয়েছে।

দেশগুলোকে পক্ষ বেছে নিতে চাপ দিয়ে অত্যাধুনিক এআই তৈরির দৌড়ে চীনকে প্রয়োজনীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মনে করে, সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গত জুলাইয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএআইসিও) নামের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই খাতে মার্কিন প্রভাব মোকাবিলায় চীন তাদের প্রযুক্তি ও সহযোগিতার কাঠামো সম্প্রসারণ করছে।

এখন পর্যন্ত কাজাখস্তানই একমাত্র দেশ, যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উভয় উদ্যোগে যোগ দিয়েছে। বিষয়টি ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া চিঠিতে দেশগুলোকে এআইয়ের বিষয়ে ‘সুচিন্তিতভাবে পক্ষ বেছে নেওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সবকিছুর অংশ হওয়ার অর্থ কোনো কিছুরই অংশ না হওয়া। প্যাক্স সিলিকা ঘোষণায় সই করা মানে কেবল সদস্য হওয়া নয়, বরং এটি একটি প্রতিশ্রুতি।’ কোনো দেশ একই সঙ্গে চীনের নেতৃত্বাধীন এআই জোটে যোগ দিয়ে কীভাবে আমাদের ইকোসিস্টেমের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারে, তা বোঝা কঠিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা

চিঠিতে সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো সমান্তরাল জোটে যুক্ত থেকে এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কবে চিঠিটি পাঠাবে বা পাঠানোর আগে এতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে কি না, রয়টার্স তা নিশ্চিত হতে পারেনি। খসড়াটিতে কোনো তারিখ দেওয়া হয়নি।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে নিয়োজিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, তারা বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ইস্যুকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার বিরোধী। দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে এআইয়ের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং কারও স্বার্থ রক্ষা করবে না।’ কাজাখস্তানের দূতাবাসও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

প্যাক্স সিলিকা চুক্তির লক্ষ্য হলো মার্কিন মিত্র ও অংশীদারদের যৌথ প্রকল্প ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, এআই মডেল ও সেমিকন্ডাক্টর চিপের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের ওপর নির্ভরতা কমানো।

প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লড়াই এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো মার্কিন কোম্পানির মালিকানাধীন (প্রোপ্রাইটারি) ব্যবস্থার বিপরীতে চীনের ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, ওপেন-ওয়েট এআই মডেল বলতে এমন প্রযুক্তিকে বোঝায়, যার প্রশিক্ষিত প্যারামিটার বা ‘ওজন’ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ফলে এগুলো ডাউনলোড করে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার বা পরিবর্তন করা যায়।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাক করার সক্ষমতাসহ এআইয়ের ক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এর শক্তি ও ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, বেইজিং তাদের শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই মডেলে বিদেশিদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার কথা ভাবছে। এতে চীনের কঠোর জাতীয় নিরাপত্তানীতির প্রতিফলন ঘটছে।

গত জুনে কাজাখস্তান প্রথম মধ্য এশীয় দেশ হিসেবে প্যাক্স সিলিকায় যোগ দিলে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখে। দেশটির কাছে উন্নত প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদের বিশাল ভান্ডার রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কযুদ্ধের জবাবে চীন তাদের খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দেশে এবং মিত্রদের কাছ থেকে এসব খনিজ সংগ্রহের চেষ্টা জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এআই প্রতিযোগিতা এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন মডেলের বিপরীতে চীনের ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্যাক্স সিলিকার সদস্যরা এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ পায়। আর এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্টে সই করা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অভিন্ন লক্ষ্য’ ও ‘ভবিষ্যৎ ভাবনা’র বিষয়ে প্রতীকীভাবে একমত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘একই সঙ্গে দুই দিকে থাকতে পারবে না’—দেশগুলোকে এটি স্পষ্ট করে দিতেই চিঠিটি খসড়া করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কোনো দেশ একই সঙ্গে চীনের নেতৃত্বাধীন এআই জোটে যোগ দিয়ে কীভাবে আমাদের ইকোসিস্টেমের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারে, তা বোঝা কঠিন।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ