প্রধান সড়কে অটোরিকশা বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম, বাস্তবায়নে সরকারের প্রস্তুত

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মিশুকের চলাচল বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। এরই মধ্যে প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে মূল কারণ হিসেবে রাজধানীর যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা, বেপরোয়া চলাচল এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে। তবে অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরিবর্তে কীভাবে এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে, কোন কোন সড়কে চলতে দেওয়া হবে এবং চালকদের জীবিকার বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয়ও সামনে রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আলোচনায় প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। জুনে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার ও ট্রাফিক বিভাগ এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যান চলাচলে চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যানবাহন হঠাৎ থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় পেছনে থাকা যানবাহনের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। আবার কোথাও কোথাও উল্টো পথে চলাচল, ট্রাফিক সংকেত না মানা ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ট্রাফিক বিভাগ মনে করে, প্রধান সড়কে ধীরগতির যানবাহনের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যান চলাচলের গতি বাড়ানো এবং যানজট কমানো সম্ভব। এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অটোরিকশার চলাচল সীমিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও যানজট নিয়ন্ত্রণের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা করা হবে।

এদিকে প্রধান সড়কে অটোরিকশা ও মিশুক চলাচল বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখা জরুরি। কিন্তু অটোরিকশার অবাধ চলাচলের কারণে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে অটোরিকশা সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থায়ীভাবে প্রধান সড়কে এসব যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় অটোরিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে যাত্রীদের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতও অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

এবিষয়ে সরকার ও ট্রাফিক বিভাগের আলোচনায় প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে  বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রথম ধাপে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে মহানগরীর অন্যান্য এলাকায়ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে অটোরিকশা চালকদের জানানো এবং এরপর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধান সড়কে চলাচল বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের আগে কোন সড়কগুলোতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, বিকল্প রুট কী হবে এবং অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয় নির্ধারণ করতে হবে।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের সঙ্গে বড় একটি প্রশ্ন জড়িয়ে আছে চালকদের জীবিকা। রাজধানীর বহু মানুষ অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। প্রধান সড়কে চলাচল বন্ধ হলে তাঁদের আয় কমে যেতে পারে। ফলে একদিকে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে চালকদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ অটোরিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে নির্দিষ্ট সড়ক ও এলাকায় চলাচলের সুযোগ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। এতে প্রধান সড়কে যানজট কমানোর পাশাপাশি স্বল্প দূরত্বের যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থাও রাখা সম্ভব হতে পারে।

রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবহারের পর ট্রাফিক আইন অমান্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন, নম্বর প্লেট ও চালকের লাইসেন্স-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা থাকায় আইন প্রয়োগে কিছু জটিলতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ফলে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নয়, যানবাহন ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। প্রধান সড়কে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষার্থীদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা—দুই বিষয় এখন একই জায়গায় এসে মিলেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রধান সড়কে অটোরিকশা ও মিশুক চলাচল বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তবে সরকারের আগের অবস্থান থেকে স্পষ্ট, প্রধান সড়কে অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নীতিগতভাবে তারা ইতোমধ্যে এগিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করা। একই সঙ্গে চালকদের জীবিকা ও সাধারণ মানুষের স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা করা না গেলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সুতরাং ৩১ আগস্ট শুধু শিক্ষার্থীদের দেওয়া একটি সময়সীমা নয়; এর মধ্যে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় তারও একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ