২৪ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট ২০২৬—এই এক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে রংপুর, সিলেট, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ীসহ অন্তত ২০টি জেলায় এ সময়ে হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হওয়ার তথ্য দৈনিক প্রকৃতির সংবাদের হাতে এসেছে। তবে হত্যাকান্ডের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ দেশের প্রতিটি থানায় নথিভুক্ত হত্যাকাণ্ডের সবগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।
এ্ই রিপোর্ট শুধুমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত হত্যাকাণ্ড সমূহের ভিত্তিতে করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানেও হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা আগের দুই বছরের তুলনায় অনেকবেশী।
গত এক মাসে সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে একটি ঘটেছে রংপুরে। একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সংবাদ অনুযায়ী, নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। একই সময়ে রংপুর নগর ও আশপাশে আরও কয়েকটি হত্যার ঘটনা ঘটে।
সিলেটেও এক মাসে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একই পরিবারের তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। মাদক, পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব—বিভিন্ন কারণ এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে উঠে এসেছে।
রাজধানী ঢাকাতেও এ সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত বিরোধ, অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব ও ছিনতাইকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা রেঞ্জের আওতাধীন জেলাগুলোতেও হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই ঢাকা রেঞ্জের ১৩ জেলায় ২৬৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
গাজীপুরে গত এক মাসে অন্তত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের খবর এসেছে। কাপাসিয়ায় অটোরিকশা ছিনতাইকারীদের হাতে আতাউর রহমান ওরফে আতা হত্যার ঘটনায় ২৪ আগস্ট পিবিআই তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এ ছাড়া পূবাইল ও কালিয়াকৈরেও হত্যার ঘটনা সংবাদে এসেছে। ফলে শিল্পনগরী গাজীপুরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নরসিংদীর মনোহরদীতে বাড়িতে ঢুকে আকাশ মিয়া নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সাবেক পৌর কাউন্সিলরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা এবং অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত চলছে।
নারায়ণগঞ্জে গত এক মাসে একাধিক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি পুরোনো হত্যাকাণ্ডের বিচারও হয়েছে। ২৩ আগস্ট বন্দরে আবুল হোসেন হত্যার মামলায় এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
তবে আদালতের রায়কে নতুন হত্যাকাণ্ড হিসেবে এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। সংবাদে নতুন করে যেসব হত্যার ঘটনা এসেছে, শুধু সেগুলোই গণনায় রাখা হয়েছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ফারুক শেখ হত্যাকাণ্ডের রহস্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ। সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মাত্র ৩ হাজার টাকায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে ২৩ আগস্ট জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তবিবার হোসেন নামে একজন নিহত হন। খুলনায় গত এক মাসে একাধিক হত্যার ঘটনা সংবাদে এসেছে। এর মধ্যে ইটভাটায় ঢুকে এক যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনাও রয়েছে।
মাদারীপুরের শিবচরে নারী ও তাঁর এক বছর বয়সী শিশুকে হত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে এ হত্যার সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগও উঠে এসেছে।
জামালপুরে গৃহবধূ হত্যার ঘটনাও সংবাদে এসেছে। পারিবারিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এ ধরনের হত্যার ঘটনা দেশের বিভিন্ন জেলায়ও দেখা যাচ্ছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—২৪ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট সময়ে ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিই গণনার ভিত্তি; শুধু ওই সময়ে কোনো পুরোনো হত্যাকাণ্ডের মামলা, গ্রেপ্তার বা আদালতের রায় প্রকাশিত হলে সেটি নতুন হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরা হয়নি। যেমন, ২৪ আগস্ট কুমিল্লায় গৃহবধূ মরিয়ম বেগম হত্যা মামলায় তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে; ঘটনাটি পুরোনো হওয়ায় এই এক মাসের নিহতের হিসাবে তা যোগ করা হয়নি।
দেশে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সংখ্যা সংবাদে পাওয়া সংখ্যার চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার অনেক হত্যাকাণ্ড জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আসে না। আবার কোনো কোনো ঘটনা স্থানীয় সংবাদে প্রকাশ পেলেও তা পরে জাতীয় সংবাদে আসে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭ এবং এপ্রিলে ২৮৮টি মামলা হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, মাদক, পারিবারিক বিরোধ, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ—এসব কারণে হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে। পুলিশও বলছে, খুনসহ গুরুতর অপরাধ দমনে অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
গত এক মাসের সংবাদ বিশ্লেষণ করলে হত্যাকাণ্ডের ধরনে একটি উদ্বেগজনক বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও পারিবারিক কলহে স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে, কোথাও মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে, আবার কোথাও ছিনতাই, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পূর্বশত্রুতা কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রাণ গেছে।
এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৫৮ জন; গত পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ৫৫। অর্থাৎ বছরের সাত মাসেই আগের পুরো বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ২৪ জুলাই থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক বিরোধ থেকে মাদক, ছিনতাই, সম্পত্তি ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব—বিভিন্ন কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পুলিশের জেলা-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।