বিজ্ঞানীদের প্রস্তাব শুনে মনে হতে পারে কোনও কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু তাঁরা মনে করেন, ওই পথেও পৃথিবীর প্রাণীজগৎকে বাঁচানো সম্ভব।
জ্বালানি ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাবে। প্রায় ৫০০ কোটি বছর পরে লাল দৈত্যে পরিণত হবে সূর্য। পুড়ে ছাই হবে পৃথিবীর মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল। গোটা পৃথিবীকেই তখন গিলে ফেলতে পারে সূর্য। আর তার পরেই সূর্য পরিণত হতে পারে সাদা রঙের একটি বামনে। তখন তার তাপ এবং আলো— কিছুই থাকবে না। তার আরও হাজার কোটি বছর পরে ছায়াপথ নতুন করে নক্ষত্র তৈরির ক্ষমতা হারাবে। আকাশে আর জ্বলবে না কোনও তারা। সে সময় পৃথিবীর কী হবে? প্রাণীজগতের কী হবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই বিকল্প ব্যবস্থাও করা যাবে।
বিজ্ঞানীর বলছেন, সে সময় অন্য গ্রহ খুঁজে সেখানে চলে না গিয়ে বরং পৃথিবীকেই বাসযোগ্য করা যেতে পারে। সে জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা। সেই গবেষণা এখন রয়েছে আর্কাইভ সার্ভারে। ‘সায়েন্স এক্স ডায়লগ’-এও রয়েছে সেই প্রতিবেদন। বিজ্ঞানীদের সেই প্রস্তাব শুনে মনে হতে পারে কোনও কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু তাঁরা মনে করেন, ওই পথেও পৃথিবীর প্রাণীজগৎকে বাঁচানো সম্ভব। তাঁদের মতে, সূর্যের প্রবল তাপ প্রতিহত করতে তার এবং পৃথিবীর মাঝে একটি মহাকর্ষীয় ভারসাম্য বিন্দু ‘ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১’-এ একটি বিশাল সানশেড বসানো যেতে পারে। সূর্য যাতে পুরোপুরি ঢাকা পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পৃথিবীর আকাশে ৭০ ডিগ্রি এলাকা জুড়ে থাকবে সেই ‘ছাতা’। তাকে চাঁদের কক্ষপথের বাইরে যাতে স্থাপন করা যায়, সেই ব্যবস্থা করলে ভাল।
বামন গ্রহ সেরেস খনন করে মিলতে পারে কার্বন টিথার। চাঁদে খননকাজ চালিয়ে মিলতে পারে অ্যালুমিনিয়াম। তা দিয়েই তৈরি করতে হবে সেই সানশেড, যার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এ বার সূর্যকে ঢেকে দেওয়ার পরে তার বিকল্প খুঁজতে হবে। সৌরজগতের যে বিশাল বিশাল গ্যাস ভরা গ্রহগুলি রয়েছে, সেগুলি লক্ষ কোটি বছর পৃথিবীকে আলোর জোগান পাঠাতে পারবে। সেগুলি পৃথিবীর অভ্যন্তরে চাপের মাত্রাও বজায় রাখতে সমর্থ হবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তাই তাঁদের প্রস্তাব, সে রকম কোনও এক বামন গ্রহে ঝাঁপ দিতে হবে পৃথিবীকে। বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে ৬,৫০০ কিলোমিটার গভীরে ভাসমান ফিউশন রিঅ্যাক্টরগুলো হিলিয়াম-৪ এবং হাইড্রোজেন গ্রহণ করে শক্তি উৎপাদন করতে পারে। তা ব্যবহার করেও পৃথিবীতে আলোর জোগান ঠিক রাখা যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, তার পরেও একটি সমস্যা থেকেই যাবে। সূর্য পৃথিবীকে গিলে ফেলতে পারে। সে ক্ষেত্রে একটি গ্রহাণুকে পৃথিবীর কাছাকাছি এনে ফেলতে হবে। সেখান দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে। তার ফলে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন হবে। তবে পৃথিবীর এত কাছ দিয়ে কোনও গ্রহাণু উড়ে গেলে ঝুঁকিও রয়েছে। তবে তার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে বিজ্ঞানীদের। তাঁদের দাবি, বৃহস্পতি থেকে অক্সিজেন আহরণ করে এবং পৃথিবীর পাশ দিয়ে একটি ছোট কণারশ্মি ছুড়ে মারা যেতে পারে। তাতেও কাজ হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।
গবেষকদের মতে, সে সময় পৃথিবীর পাতের সঞ্চালনও বন্ধ হতে পারে। তা চালু করতে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে বিশাল গর্ত খনন করে গলিত লোহা ঢেলে দেওয়া যেতে পারে। পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছোতে দু’সপ্তাহ সময় লাগবে সেই লোহার। সবশেষে ছায়াপথে সংঘর্ষের দিকে নজর রাখতে হবে। বৃহস্পতির ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট ১-এ থাকা পৃথিবীর লঞ্চারটি ব্যবহার করে সূর্যের উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর ঠিক উপর বা নীচে দিয়ে একটি হাইড্রোজেন রশ্মি ছোড়া যেতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় স্লিংশট ধীরে ধীরে পুরো সৌরজগৎকে সরিয়ে নেবে। এড়ানো যাবে সংঘাত।
তবে এ সবের প্রয়োজন হবে আর হাজার হাজার কোটি বছর পরে, যখন মহাকাশে একটি নক্ষত্রও আর থাকবে না। তার আগে ঋতু পরিবর্তন, দিনের কড়া রোদ, তারা ভরা আকাশ চুটিয়ে উপভোগ করতে পারবেন পৃথিবীবাসী। – সূত্র: