অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেন করতেন আরিফুল ইসলাম রিফাত। দীর্ঘ দুই বছর ধরে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবশেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের একটি দল গাজীপুরের একটি রিসোর্ট থেকে দুই সহযোগীসহ আরিফকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে একই চক্রের আরও তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—আরিফুল ইসলাম রিফাত, আরমান হোসেন জিহাদ, মাসুদ হোসেন, আব্দুল রাব্বী, কৌশিক আহমেদ শুভ ও মশিউর রহমান তারেক। তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (বিকাশ ও নগদ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে।
ডিবি জানায়, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে পরিচালিত একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছিল। পরে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সংঘবদ্ধ চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের টঙ্গীর একটি রিসোর্ট থেকে প্রথমে তিনজনকে এবং পরে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের একটি হোটেল থেকে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ পরিচালনায় Pay Kashma, Gopay, Lucky Pay, LQ Pay, XE Pay ও Cool Pay নামের কয়েকটি পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে। মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণের জন্য তারা বড় রেজিস্টার বই ব্যবহার করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
চীনা নাগরিকের নিয়ন্ত্রণে পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, দৈনিক ৭০০–১ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য
পুলিশ জানায়, বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে কাজ করা অধিকাংশ পেমেন্ট কোম্পানি চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে। এসব কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য হওয়ায় এবং তুলনামূলক দুর্বল নজরদারির সুযোগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জুয়ার সাইট পরিচালনায় সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। দিন শেষে এসব অ্যাকাউন্টের অর্থ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে বাইন্যান্স, বাইবিট ও বিটগেটের মতো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মে ইউএসডিটি কিনে বিদেশে থাকা পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেটে পাঠানো হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, বাংলাদেশ অংশের মূলহোতা আরিফুল ইসলাম রিফাত। তার অধীনেই অন্যরা Gopay নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করতেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তার ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি একজন চীনা নাগরিক নাথান, যিনি ‘এলিয়েন’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ জানিয়েছেন, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ কমিশন দিত। প্রাপ্ত অর্থের অর্ধেক তিনি বিভিন্ন ভেন্ডরের মধ্যে বিতরণ করতেন। এসব ভেন্ডরের মধ্যে এমএফএস এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার, হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তিও কমিশনের অংশ পেতেন। এ ছাড়া আবাসন, খাবার ও যাতায়াতসহ অন্যান্য ব্যয়ও কোম্পানি বহন করত।
বিলাসী জীবনযাপন আরিফের, থাকতেন ৫০ হাজার টাকা ভাড়ার রিসোর্টে, চড়তেন বিএমডব্লিউতে
ডিবিপ্রধান বলেন, আরিফের ব্যবহৃত ডিভাইস বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে এ-সংক্রান্ত আরও চারটি মামলা রয়েছে এবং তিনি অতীতেও গ্রেপ্তার হয়েছেন।
তিনি বলেন, অবৈধ উপার্জনের অর্থে আরিফ বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। সম্প্রতি পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কে তার একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লেও পরে তিনি আরেকটি বিএমডব্লিউ কিনেছেন।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের সময় যে রিসোর্টে আরিফ অবস্থান করছিলেন, সেখানে তিনি তিনটি কক্ষ বুক করেছিলেন। তিনি যে কক্ষে ছিলেন, সেটির দৈনিক ভাড়া ছিল ৫০ হাজার টাকা। সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন এক জায়গায় অবস্থান করে পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে অন্য কোনো হোটেল বা কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলে চলে যেতেন। দীর্ঘদিন এভাবেই তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে ছিলেন।
দেশে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন কী পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।এছাড়াও
অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রের বিরুদ্ধে
সিআইডির চলমান অভিযানে আরও ০২ সদস্য গ্রেফতার
অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থেকে নিজেদের কমিশন কর্তনের পর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচারকারী চক্রের আরও ০২ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)’র সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। সাইবার পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট শাখার একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ১২/০৭/২০২৬ খ্রি. নড়াইল জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— ০১। মো. জসিম উদ্দীন (৩৩) (USO, নগদ), পিতা: মো. ওলিয়ার মোল্যা, মাতা: আবেরন বেগম, ঠিকানা: সাং- তুলারামপুর, পোস্ট- তুলারামপুর-৭৫০০, থানা- নড়াইল সদর, জেলা- নড়াইল; এবং ০২। সুমন রায় (২৮), পিতা: সমীর রায়, মাতা: সবিতা রায়, ঠিকানা: সাং- মালিয়াট, ইউনিয়ন- শেখহাটী, পোস্ট- এগারখান-৭৪০৬, থানা- নড়াইল সদর, জেলা- নড়াইল।
০১ নং আসামি মো. জসিম উদ্দীনকে গত ১২/০৭/২০২৬ খ্রি. রাত ২০:৩০ ঘটিকায় নড়াইল সদর থানাধীন রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন মুচিপোল, সোনাপট্টি রোডে অবস্থিত মো. ওয়াহিদুজ্জামানের বাসার তৃতীয় তলায় অবস্থিত নগদ ডিস্ট্রিবিউশন হাউজ থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন রাত ২১:০০ ঘটিকায় নড়াইল সদর থানাধীন তুলারামপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে ০২ নং আসামি সুমন রায়কে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি একটি বিদেশি অনলাইন জুয়া সাইটের অ্যাডমিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সিপিসি নিয়মিত সাইবার মনিটরিং চলাকালে দেখতে পায় যে, দেশের অভ্যন্তর এবং বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন বেটিং (জুয়া) ওয়েবসাইট সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে এবং অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বেটিং পরিচালিত হচ্ছে। বেটিং সাইটে ব্যবহৃত বিভিন্ন এজেন্টের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন (ডিএমপি) থানায় মামলা নং-২০, তারিখ: ১৭/০৫/২০২৬ খ্রি., সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২)/২১(২)/২২(২)/২৪(২)/২৭(২)/২৯(২) ধারায় মামলা রুজু করে।
মামলা রুজুর পর সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন বেটিংয়ের এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত এবং সেগুলো বেটিং সাইটে ব্যবহার করত। জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টরা কমিশন কেটে রাখার পর বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে অর্থ পাচার করত বলে তথ্য পাওয়া যায়। মামলার তদন্তে অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে ব্যবহৃত বিভিন্ন এজেন্ট নম্বরের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত মো. জসিম উদ্দীন ও সুমন রায় নিজেদের নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার সাইটে সক্রিয় ছিলেন। এছাড়া তারা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত এজেন্ট সিম সংগ্রহ করে চক্রের সদস্যদের কাছে সরবরাহ করতেন। এসব এজেন্ট সিম অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ জমা ও উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হতো। তদন্তে তাদের জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনার সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। গ্রেফতারকৃতদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন, অর্থপাচার কার্যক্রম এবং এ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের লক্ষ্যে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, এ মামলায় পূর্বে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় সিআইডির একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ০৭/০৬/২০২৬ খ্রি. টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে অনলাইন জুয়া ও অবৈধ অর্থপাচার চক্রের মো. সোলায়মান (৪৭), মো. সাগর মিয়া (২৮) এবং মো. জুয়েল রানা (৩২)-কে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে গত ১৬/০৬/২০২৬ খ্রি. নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে চক্রের আরও মো. রায়হান খান (২১), মো. পাভেল রহমান ভূঁইয়া (২৩) এবং আবু জোবায়ের সানি (৩৬)-কে গ্রেফতারপূর্বক বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়।