বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান দিবস আজ

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিযুগের অন্যতম তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান দিবস আজ। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট মুজাফফরপুর কারাগারে ব্রিটিশ শাসকদের হাতে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।

অল্প বয়সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা ক্ষুদিরাম পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সাহস ও আত্মত্যাগের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হন।

শৈশব থেকেই দেশপ্রেমের পথে

ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু এবং মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। পরিবারের সন্তানদের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। শৈশবেই বাবা-মাকে হারানোর পর বোনের কাছে তাঁর লালন-পালন হয়।

তাঁর নাম ‘ক্ষুদিরাম’ হওয়ার পেছনেও রয়েছে পারিবারিক একটি প্রচলিত কাহিনি। কথিত আছে, আগের দুই সন্তান অল্প বয়সে মারা যাওয়ার পর তাঁকে তিন মুঠো খুদের প্রতীকী বিনিময়ে তাঁর বড় বোনের কাছে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই তাঁর নাম হয় ক্ষুদিরাম।

স্বদেশি আন্দোলনে যোগদান

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে যখন বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন কিশোর ক্ষুদিরামও সেই আন্দোলনের প্রভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। ব্রিটিশবিরোধী চেতনা তাঁকে ধীরে ধীরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দিকে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে তিনি সত্যেন বসুর নেতৃত্বাধীন একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে শরীরচর্চা ও রাজনৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও নেন।

স্বদেশি আন্দোলনের সময় ব্রিটিশ পণ্য বর্জন, বিদেশি কাপড় পোড়ানোসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯০৬ সালে মেদিনীপুরের একটি কৃষি ও শিল্পমেলায় ব্রিটিশবিরোধী প্রচারপত্র বিতরণের সময় পুলিশ তাঁকে আটক করলেও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

পরবর্তী সময়ে ডাকের থলি লুট এবং ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা

ব্রিটিশ সরকারের কঠোর ও দমনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড বিপ্লবীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ১৯০৮ সালে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর।

এই দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে। তাঁরা মুজাফফরপুরে গিয়ে কিংসফোর্ডের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে শুরু করেন।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে ইউরোপীয় ক্লাবের কাছে কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু ভুলবশত অন্য একটি গাড়িতে বোমা পড়ে। এতে গাড়িতে থাকা দুই ইংরেজ নারী নিহত হন। পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

গ্রেপ্তার ও বিচার

ঘটনার পর ক্ষুদিরাম দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ওয়ানি রেলস্টেশনের কাছে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন।

বিচারের সময় ক্ষুদিরাম নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দায় স্বীকার করেন এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট মুজাফফরপুর কারাগারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।

‘একবার বিদায় দে মা’—অমর হয়ে আছে স্মৃতিতে

ক্ষুদিরামের ফাঁসিকে ঘিরে বাংলায় একটি জনপ্রিয় গান বহু বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। গানটির রচয়িতা ও সুরকার কে—এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ এর সঙ্গে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাসের নাম যুক্ত করেন, আবার কেউ বরিশালের চারণকবি মুকুন্দ দাসকে রচয়িতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীকালে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সুভাষচন্দ্র’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয় এবং লতা মুঙ্গেশকর গানটির নেপথ্য কণ্ঠ দেন। এরপর গানটি আরও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগ ও ফাঁসির ঘটনা নিয়ে রচিত এই গান বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিতে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

তরুণ বিপ্লবীর আত্মত্যাগ

ক্ষুদিরাম বসুর জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগ তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার যে সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

তাঁকে নিয়ে কবিতা, গান, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ক্ষুদিরাম আজও এক তরুণ বিপ্লবীর প্রতীক।

বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদও ক্ষুদিরামকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাঁর রচনায় এই তরুণ বিপ্লবীর আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

ইতিহাসে ক্ষুদিরামের স্থান

ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদানের এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু তাঁর নাম এখনও ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা এই তরুণ বিপ্লবীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ডে তৈরি হয় না; অসংখ্য তরুণের আত্মত্যাগ, সাহস ও স্বপ্নও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

১১ আগস্ট তাই ক্ষুদিরাম বসুকে স্মরণ করার দিন। তাঁর আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাঙালি ও উপমহাদেশের মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ