হাওরের চারদিকে শুধু পানি আর পানি, কমছে কৃষকের বাঁচার স্বপ্ন

প্রকৃতির সংবাদ ডেস্ক
প্রকাশের সময় রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

কিশোরগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন আর নতুন ধানের ঘ্রাণ নেই, নেই ফসল ঘরে তোলার উৎসবের আমেজ। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। যে মাঠে কিছুদিন আগেও সোনালি ধানে দুলছিল বাতাস, আজ সেই মাঠ বুকসমান পানির নিচে। কৃষকের চোখে এখন স্বপ্ন নয়, জমে আছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া।

গত দুদিন ভারী বৃষ্টি না হলেও মাঝে-মধ্যে রোদ উঠেছিল। এতে কৃষকের মনে ক্ষীণ আশার আলো জেগেছিল-হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু সেই আশায় আবারও পানি ঢেলে দিয়েছে শনিবার (২ মে) সকাল থেকে শুরু হওয়া থেমে থেমে বৃষ্টি। আগের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ক্ষেত নতুন করে পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও ২ হাজার হেক্টর বোরো জমি প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টরে। এতে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্তত ৩২ হাজার কৃষক। বছরের একমাত্র ফসল হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, এবার জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই চাষ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। ইতোমধ্যে ৫৯ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হলেও বাকি জমিগুলো এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওর এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে শুধু ইটনা উপজেলাতেই প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, মাঠের ধান চোখের সামনেই বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে জমির কোথাও কোমর পানি, কোথাও বুকসমান পানি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আধাপাকা ধান কেটে ছোট ছোট নৌকায় করে বাড়ি নিয়ে আসছেন। কিন্তু শ্রমিক সংকট এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুঃশ্চিন্তা। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক হাওরে যেতে চাইছেন না। যারা যাচ্ছেন, তারা নিচ্ছেন দ্বিগুণ-তিনগুণ মজুরি। এত খরচ করেও কিন্তু তারা তাদের সোনালী ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না।

শুধু ধান কাটা নয়, কাটা ধান মাড়াই, শুকানো ও ঘরে তোলা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চিয়তা। বৃষ্টিতে শুকানোর মাঠ তলিয়ে গেছে। খলায় রাখা কাটা ধানও পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও আবার পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এতে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ছে।

এদিকে হাওরে বৃষ্টি ও পানি বেশি হওয়ায় ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন নিয়ে জমিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে গেছে। ফলে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। যেসব জমিতে ধান এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে না পারলে পুরো ফসল পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ইটনা পয়েন্টে ধনু ও বৌলাই নদীর পানি, চামড়াঘাটে মগরা নদীর পানি এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বেড়েছে। যদিও এখনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তবে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগাম বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনু, বৌলাই, মগরা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী, করাতিয়া, কলকলিয়া, বৈঠাখালী ও কলমারবাকসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানি উপচে হাওরে ঢুকে একের পর এক ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

মাত্র দশ দিন আগেও হাওরের মাঠে ছিল উৎসবের আমেজ। কৃষকের ঘরে নতুন ধান ওঠার আনন্দ, গোলাভরা ফসলের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে ছিল এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম রূপ সেই আনন্দ কেড়ে নিয়েছে চোখের সামনে। এখন কৃষকের কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন-“সারা বছরের ভরসা যদি পানিতে ভেসে যায়, তাহলে পরিবার নিয়ে বাঁচবো কীভাবে?”

হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য-আকাশে কালো মেঘ, মাঠে থইথই পানি, আর কৃষকের চোখে অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্ক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ