আশা ভোঁসলে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আজকের দিনে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে মঙ্গেশকর পরিবারে জন্ম তার। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন পুনে থেকে কোলহাপুরে এবং পরবর্তী সময়ে মুম্বাইয়ে।
১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে জীবনে প্রথমবার সিনেমায় গান করেন আশা। মারাঠি সিনেমা ‘মাঝা বাল’-এর ‘চালা চালা নভ বালা’ গানটি শোনা যায় তার কণ্ঠে। হিন্দি সিনেমার জগতে পা রাখা ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে হংসরাজ বেহলের ‘চুনারিয়া’ দিয়ে। তবে হিন্দি সিনেমাতে আশার প্রথম একক গান শোনা গিয়েছিল ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তি পাওয়া ‘রাত কি রানি’তে। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে থেকে হিন্দি সিনেমার জগতে ধীরে ধীরে শুরু হয় তার উত্থান। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে গান করছেন কিংবদন্তি এ শিল্পী। তার গান শ্রোতাদের এখনো মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় গান করেছেন তিনি; গেয়েছেন সংগীতের বিভিন্ন ধারায়। সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করার জন্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে তার নামও রয়েছে। পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে, পদ্মবিভূষণসহ নানা পুরস্কার। এখনো গান করছেন আশা।
এক জীবনে কত গান, কত বিচিত্র সুরেই না গেয়েছেন আশা। যে কণ্ঠে তিনি গেয়েছেন ‘ছোটাসা বালমা’, ‘মেরা মন দর্পণ’-এর মতো রাগপ্রধান গান; তেমনি সেই কণ্ঠে তুলেছেন ‘ভোমরা বড়া নাদান’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’-এর মতো আসর জমানো গান। আজও এসব গানে কনসার্ট তুঙ্গে ওঠে। এখনো এসব গানের রিমিক্স হয়। শুধু কি হিন্দি সিনেমার গান? সেই সময়ের সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় শাসিত ভারতীয় বাংলা সিনেমায় ঢুকতে খুব বেশি সময় লাগেনি আশার। চলচ্চিত্রের গানের পাশাপাশি নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক গানেও পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। গুলাম আলির সুরে ‘মিরাজ-ইয়ে-গজল’ সংকলন, হরিহরণের সুরে গজল সংকলন ‘অবসর-ইয়ে-গজল’, জয়দেবের সুরে ‘সুরাঞ্জলি’ তারই উদাহরণ। কোনো কোনো বিরূপ সমালোচনাকে ছাপিয়ে আশার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবামও দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে শ্রোতামহলে। আবার নজরুলের গান কণ্ঠে নিয়েও সংগীতপ্রিয় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।
সঙ্গীতজীবনে দীর্ঘ ৫ দশক সেরা শিল্পীর দৌড়ে ছিলেন এই দুই বোন লতা ও আশা। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নয়া দৌড়, আশা, নবরঙ্গ, মাদার ইন্ডিয়া, দিল দেকে দেখো, পেয়িং গেস্ট প্রমুখ চলচ্চিত্রে একেরপর এক হিট গান গেয়ে লতাকে হটিয়ে রাতারাতি বলিউডের শীর্ষস্থান পেয়ে যান আশা, যার পুরোটাই ওপি নায়ারের বদৌলতে। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হাওড়া ব্রিজ, কাগজ কে ফুল, ফাগুন প্রমুখ ছবির মাধ্যমে জয়যাত্রা অব্যাহত রাখেন। তবে বেশিদিন শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারেননি তিনি। কারণ, ওপি নায়ার ছাড়া বাকি সব প্রথমসারির সুরকারদের প্রথম পছন্দ ছিল লতা।
তাই, ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দেই পূর্বের ছন্দ ফিরে পান লতা। তবে, ১৯৭০- এর দশকে লতাকে একেবারে হাড্ডাহাড্ডি টক্কর দেন আশা। কারণ, লক্ষ্মীকান্ত পেয়ারেলাল যেমন লতাকে সব ছবিতেই প্রাধান্য দিতেন তেমনি আর ডি বর্মন আর কল্যাণজি আনন্দজী প্রাধান্য দিতেন আশাকে। এছাড়া লতা যেমন হেমা মালিনী, রাখী, মুমতাজ, মৌসুমী চ্যাটার্জির জন্য চিরস্থায়ী কণ্ঠ ছিলেন তেমনি আশার কণ্ঠ আরোপ করা হত জীনাত আমান, পারভীন ববি, রেখা ও শর্মিলা ঠাকুরের প্রতিটি ছবিতে।