দখল–দূষণে নাকাল ঢাকাবাসী

শফিকুল আলম সেলিম
প্রকাশের সময় শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

৮০ বছরে হারিয়েছে ১২০ কিলোমিটার খাল, ৫৬টির মধ্যে ২৬টির অস্তিত্ব নেই; নদীতে ২২৪ বর্জ্য নিঃসরণস্থল, বাতাসেও বিষ

একদিকে খাল দখল করে গড়ে উঠেছে ভবন, রাস্তা ও স্থাপনা। অন্যদিকে সেই খালেই পড়ছে গৃহস্থালি বর্জ্য, পয়োবর্জ্য ও বিভিন্ন ধরনের দূষিত পানি। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আর শহরের বাতাসে মিশছে নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানা ও বর্জ্য পোড়ানোর দূষণ।

রাজধানী ঢাকার পরিবেশগত সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। খাল দখল, জলাশয় হারানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নদীদূষণ ও বায়ুদূষণ—সবকিছু মিলেই নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।

ঢাকার বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ খাল হারিয়ে যাওয়া। নদী ও ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) বিশ্লেষণে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক মানচিত্রের সঙ্গে ২০২২ সালের স্যাটেলাইট চিত্র তুলনা করে দেখা গেছে, গত আট দশকে ঢাকায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার প্রাকৃতিক খাল হারিয়ে গেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, দখল, ভরাট এবং বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়ে এসব জলপথের একটি বড় অংশ বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ঢাকার ৫৬টি ঐতিহাসিক খালের মধ্যে ২৬টির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ যে খালগুলো একসময় বৃষ্টির পানি ধরে নদীতে পৌঁছে দিত, সেগুলোর একটি বড় অংশই এখন নেই। ফলে অতিবৃষ্টির সময় পানি সরানোর প্রাকৃতিক পথও সংকুচিত হয়েছে।

রাজউকের ড্যাপ-২০২২-এর তথ্যও ঢাকার জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকার সংকটের চিত্র তুলে ধরে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ একর বন্যাপ্রবাহ এলাকা ও জলাশয় হারিয়েছে বলে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

দখল ও দূষণের ভয়াবহতা স্বীকার করে এবার রাজধানীর ৫৬টি খাল দখলমুক্ত ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৯টি—মোট ৫৬টি খালের দখলমুক্তকরণ কার্যক্রম চালানো হবে। দখলমুক্তির পর খালের সীমানা নির্ধারণ এবং দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—আগেও খাল উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাহলে এত বছর পরও কেন একই খাল আবার দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরেই ঢাকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা লুকিয়ে আছে—উদ্ধারের পর খালকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

খালের অবস্থা বোঝার জন্য মিরপুর-১২ এলাকার মুসলিম বাজার খালের উদাহরণই যথেষ্ট।

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জুন থেকে মুসলিম বাজার খাল পরিষ্কারে শত শত ট্রাক বর্জ্য, পলি ও স্লাজ অপসারণ করা হয়েছে। ২০ জুনের মধ্যে সেখানে প্রায় ৪৫০ ট্রাক ময়লা-আবর্জনা অপসারণের কথা জানানো হয়।

অর্থাৎ খালটি শুধু দখলের কারণে সংকুচিত হয়নি; দীর্ঘদিনের বর্জ্য জমে এর পানি ধারণ ও প্রবাহক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এমন পরিস্থিতি রাজধানীর আরও অনেক খালে রয়েছে। কোথাও খালের জায়গায় স্থাপনা, কোথাও রাস্তা, কোথাও দোকানপাট; আবার কোথাও খালের পানিই পরিণত হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়ে।

খালের সংকট শেষ হচ্ছে নদীতে গিয়ে। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও দূষিত পানির চাপ বহন করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক সভায় জানানো হয়েছে, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে মোট ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণের উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি।

অর্থাৎ নদীর পানিতে দূষণ শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও বর্জ্য ফেলার কারণে হচ্ছে না; চিহ্নিত ২২৪টি নির্গমনপথ দিয়েই বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নদীতে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।

এই তথ্য ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আনে—বর্জ্য উৎপাদন থেকে সংগ্রহ, পরিবহন, শোধন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপভিত্তিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যের ৮০ শতাংশের বেশি ঢাকার আন্তঃসংযুক্ত নদী ও জলপথে গিয়ে পড়ে।

বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, ঢাকার অর্ধেকের বেশি খাল হারিয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে আটকে গেছে।

এখানেই দখল ও দূষণের সম্পর্কটি সবচেয়ে স্পষ্ট।

খাল দখল হলে পানির ধারণক্ষমতা কমে যায়। খালে বর্জ্য জমলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পয়োবর্জ্য সরাসরি খাল-নদীতে গেলে পানি দূষিত হয়। এরপর সেই দূষিত পানি নদীর পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর ওপরও প্রভাব ফেলে।

অর্থাৎ একই ব্যবস্থার একটি অংশের ব্যর্থতা অন্য অংশের সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানা, হাসপাতালের বর্জ্য, নৌযানের তেল ও বর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎসকে নদীদূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফলে নদী বাঁচাতে শুধু নদীর পাড় থেকে দখলদার উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নদীতে যে দূষিত পানি ও বর্জ্য ঢুকছে, সেই উৎসগুলোও বন্ধ করতে হবে।

ঢাকার সংকট শুধু পানি ও খালে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের বাতাসও দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক মাত্রায় দূষিত।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ঢাকায় বার্ষিক PM2.5-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি। ২০২৩ সালে বৃহত্তর ঢাকায় গড় PM2.5 ঘনত্ব প্রায় ৯২ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার পাওয়া যায়, যেখানে WHO-এর বার্ষিক নির্দেশিকা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার।

২০২৫ সালের হিসাবেও বাংলাদেশের বার্ষিক গড় PM2.5 ছিল ৬৬ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার—WHO-এর নির্দেশিকার ১৩ দশমিক ২ গুণ।

ঢাকায় এই দূষণের পেছনে যানবাহন, নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলা, শিল্প ও ইটভাটা এবং বর্জ্য পোড়ানোসহ একাধিক উৎস কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ঢাকায় পৌর বর্জ্য খোলা জায়গায় পোড়ানো থেকেই জনসংখ্যা-ওজনযুক্ত বার্ষিক PM2.5-এর প্রায় ১১ শতাংশ আসে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু খাল উদ্ধার নয়; উদ্ধার করা খালকে আবার দখল ও দূষণমুক্ত রাখা।

সরকার বলছে, ৫৬টি খাল দখলমুক্ত করার পর সীমানা নির্ধারণ এবং গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চালানো হবে।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, একবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। খালের জমির সীমানা স্পষ্ট করা, সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে বাস্তব সীমানা মিলিয়ে দেখা, নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা এবং বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান—সবগুলো একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

ঢাকার পানি ও পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় বড় অঙ্কের অর্থও ব্যয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পানি দূষণ কমানো, স্যানিটেশন ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধারের জন্য ৩৭ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।

কিন্তু এত উদ্যোগের পরও যদি খাল দখল হয়, নদীতে ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণস্থল থাকে এবং বায়ুতে PM2.5 নিরাপদ মাত্রার বহু গুণ বেশি থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সমস্যা কি অর্থের, নাকি বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির?

ঢাকার সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। একদিকে খাল পুনরুদ্ধারের ঘোষণা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও বড় প্রকল্প; অন্যদিকে একই শহরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলপথ, নদীতে যাচ্ছে অপরিশোধিত বর্জ্য এবং বাতাসে বাড়ছে দূষণ।

ঢাকার দখল–দূষণের দায় কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো কঠিন। খাল ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত।

কিন্তু বহু সংস্থার দায়িত্ব থাকার অর্থ যদি হয়—কেউই পুরো সমস্যার দায় নেবে না, তাহলে শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির দায় গিয়ে পড়ে নাগরিকের ওপর।

সাম্প্রতিক উদ্যোগে ৫৬টি খাল দখলমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিটি খালের জন্য কতটুকু জমি দখলে আছে, কারা দখলে আছে, কোন সংস্থার জমি বা সম্পত্তি জড়িত, কত স্থাপনা উচ্ছেদ হবে, কত বর্জ্য অপসারণ হবে এবং উচ্ছেদের পর কে পাহারা দেবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা।

একইভাবে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের ২২৪টি বর্জ্য নিঃসরণস্থলের প্রতিটির অবস্থান, মালিকানা, বর্জ্যের ধরন এবং কোন কর্তৃপক্ষের আওতায় পড়ে—সেই তথ্যও জনসম্মুখে আনা জরুরি।

কারণ ঢাকার পরিবেশ সংকটের সমাধান শুধু স্লোগানে নয়, দখলদারের নাম, দূষণের উৎস এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্যেই।

রাজধানীর খাল-নদী যদি আবার সচল করা যায়, বর্জ্যের প্রবেশপথ বন্ধ করা যায় এবং বায়ুদূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবেই ‘বাসযোগ্য ঢাকা’ কেবল পরিকল্পনার কাগজে নয়, বাস্তবেও ফিরতে পারে।

তার আগে পর্যন্ত দখল–দূষণের ভারে নাকাল ঢাকাবাসীর প্রশ্ন থেকেই যাবে—যে শহরকে বাঁচানোর এত উদ্যোগ, সেই শহরের খাল-নদী-বাতাস রক্ষার দায় শেষ পর্যন্ত কার?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ